লাভ ইন ওমান – 32

আস্তে আস্তে প্লেন থেকে বের হোয়ে এলাম। ওকে শেষ বারের মতো হেল্প করলাম ওর সুটকেস নিয়ে প্লাস আর দু’টো ব্যাগ ভরা গিফট নিয়ে। ফাতিমাহ আর পাইলটকে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমরা প্লেন থেক বের হোয়ে এয়ারব্রিজ এর ভেতর দিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে রওনা দিলাম। পেছন থেকে ফাতিমাহ বলল যে ওকে যেন আসছে ঈদ বাংলাদেশে করার জন্যে ওকে পাঠিয়ে দেই।

আমি ওর কোমড় ধরে হাঁটছিলাম। আমি ওকে বললাম যে যেহেতু ও প্রথমবারের মতো ইমিগ্রানট হোয়ে আসছে সেজন্যে ওর সময় লাগবে । ইমিগ্রেশন ওর সেই সিলড এনভেলাপটা নেবে, ফিঙ্গার প্রিন্ট নেবে, ছবি তুলবে, গ্রীন কার্ডের জন্যে প্রসেস করবে আর এতে বেশ সময় লাগবে। আমি ডিস এম্বারকেশন কার্ড, কাস্টমস ফর্ম , আর হলুদ এনভেলাপ যেটা আমেরিকান এমব্যাসি দিয়েছিল সব একসাথে ভালো করে গুছিয়ে দিলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,” ভয় পাচ্ছ ?” ও বলল,” না। আমি ওকে সাহশ দেয়ার জন্যে বললাম,” চিন্তা কোরনা। এখানের ইমিগ্রেশন ভালো । বাংলা অনুবাদের জন্যে বাঙালি আছে। তোমাকে কোন ঝামেলাই করবে না তবে একটু সময় লাগবে কাগজ পত্র ঠিক করতে। বলতে বলতে এসে দাঁড়ালাম লাগেজ নেয়ার জন্যে । ওর দু’টো ছোট লাগেজ। তেমন কিছুই নেই । আমি আমার লাগেজ উঠিয়ে নিলাম ট্রলিতে। ওর জন্যে নিয়ে এলাম আর একটা ট্রলি। “শোন কোন চিন্তা কোরনা। বরকে ভালোবাসার চেষ্টা কোর যাতে সেও তোমাকে ভালোবাসে । নিজেকে কখনো একা ভেবনা। আমি তোমার সাথে চিরদিন থাকব।“

চোখে টলটল করা অস্রু নিয়ে ও আমাকে বলল,” তোমার জানার দরকার নেই যে আমি কিভাবে আছি। তোমার হৃদয়ই বলে দেবে যে আমি কেমন আছি। হয়তো কোনদিন আমাদের আবার দেখা হবে। যখনি আমি শপিং মলে বা বাইরে যাবো আমার চোখ শুধু তোমাকই খুঁজে বেড়াবে। যদিও বলেছি যে তুমি আমার সামনে আসবেনা কিন্তু আমি জানিনা যে আমি থাকতে পারবো কিনা আমার প্রতিজ্ঞায়। এতোটাই ভালোবাসি তোমাকে যে বলতে পারবনা।

তুমি আমাকে গত ৭ টা দিন দিয়েছিলে শর্তহীন ভালোবাসা এটা যেনেও যে আমরা কোনদিনই এক হোতে পারবনা। আমি জানি আমার মতো তুমিও কাঁদবে সারা জীবন। কিন্তু আমি এটাও জানি যে তোমার মতো লোক যার বুক ভরা ভালোবাসা আছে সে কখনো আনহ্যাপি হবেনা। আমি সবসময় তোমার জন্যে প্রার্থনা করে যাব। “ ও আমার হাত শক্ত করে ধরল। ওর লম্বা নখগুলো আমার চামড়ার ভেতর দিয়ে ঢুকে গেল। আমি বুঝে গেলাম যে কতো কষ্টে ও যাচ্ছে আমাকে ছেড়ে।

আস্তে আস্তে আমরা ইমগ্রেশনের দিকে হাঁটছিলাম। অল্প ক’জন যাত্রি মাত্র। কোন ভীড় নেই। আমি বললাম যে আমি সিটিজেন তাই আমাকে যেতে হবে অন্য লাইন দিয়ে আর ও যাবে আর একটা লাইন দিয়ে যেখানে ওর সব কাগজপত্র চেক করে ওর গ্রীনকার্ডের জন্যে ছবি তুলে রাখবে। যতক্ষন পারলাম একসাথে রইলাম। যখন কেউ রইল না তখন একজন এজেন্ট আমাকে বলল যে আমাকে যেতে হবে। আমি একটু সময় চেয়ে নিলাম। এজেন্ট ওকে বলে চলে গেল।

শেষ পর্যন্ত আমি ওকে বললাম যে কথাগুলো বলার মত শক্তি আর সাহস আমার ছিলনা , বাধ্য হোয়ে বললাম,” যাও সোনা আমার। তোমাকে এতো ভালোবাসি যে কোনদিন তোমাকে ভুলবনা। “ ও প্লেন থেকে নামার পর থেকেই চুপ হোয়ে গেছে। আমি বললাম,’ প্লিজ কিছু বল।“ ও করুণভাবে আমার দিকে তাকাল। চোখে জল। “ আমি পারবনা। আমি অন্য কারো সাথে যেতে পারবনা। হয় আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দাও নয় আমি তোমার সাথেই যাবো । আমাকে তুমি নিয়ে যাও প্লিজ।“ আমার চোখে জল এসে গেল।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম,” তুমি জান যে আমি যদি পারতাম তবে তোমাকে বলতে হতোনা। আমি প্রমিস করছি যদি এর পরে জীবন থাকে তবে আমি সেই জীবনে শুধু তোমার হব।“
ও কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আমি জানতে চাইনা যে আরও কোন জীবন আছে কিনা। আমি আর এক জীবন পর্যন্ত ওয়েট করতে পারবনা। তাই যদি হয় তা’হলে আমি এখনি মরতে চাই।“ আমি একেবারে শকড হোয়ে গেলাম। আশে পাশের দুই একজন এজেন্টরা দেখছিল। আমি বললাম,” পাগলামি কোরনা। তোমাকে বাঁচতে হবে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হোয়ে যাবে। আমার কথা মনেও হবে না। আমি হোয়ে যাবো একটা দুরের কোন স্মৃতি।“

“ তুমি তাই ভাব। তুমি আমাকে মনে রাখতে না পার কিন্তু আমি তোমাকে মনে রাখব। প্রতি দিন প্রতি রাত আমি তোমারই পুজা করে যাবো আর তোমারই অপেক্ষা করব। “
ইমিগ্রেশন অফিসার এসে বলল,” স্যার আমাদের আরো কাজ আছে। প্লিজ ইমিগ্রেশন করিয়ে নিন।“ ও আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকার ব্যার্থ চেষ্টা করল। মনে হোচ্ছিল যে ও উট পাখির মতো মাটির ভেতরে মুখ লুকিয়ে আছে আর ভাবছে যে কেউ ওকে দেখতে পাচ্ছেনা।

শেষে বললাম,” আর সময় নেই সোনা। যেতেই হবে। আমার জন্যে এটা খুব কঠিন তোমাকে ছেড়ে যাওয়া । এর চেয়ে আর বেশী কঠিন বানিয়ে তুলোনা।“ জোর করে ওর হাতের বাঁধন আলগা করতে বাধ্য হলাম। মনে মনে কতো যে মাফ চাইলাম যে তার হিসাব নেই। ‘আমাকে মাফ করে দিও সোনার মেয়ে। মাফ করে দিও। আবার কোনদিন যদি দেখা হোয়ে যায় আমাকে ঘৃণা কর। তোমার অমন পবিত্র ভালোবাসার যোগ্য আমি নই। আমি একটা খুনি। “

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম । আস্তে আস্তে ও এগুতে লাগল অফিসারের দিকে। হঠাৎ করে ও পেছন ঘুরে তাকাল আর এক দৌড়ে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি কেঁদে ফেললাম। জড়িয়ে ধরলাম । বুকের সাথে আঠার মতো লেগে রইল। আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। ওর দিকে না তাকিয়ে সোজা সিটিজেন লিখা কাউনটারে যেয়ে এ্যারাইভাল সীল দিয়ে বের হোয়ে গেলাম। এক মিনিটেই বের হোয়ে গেলাম ওই এরিয়া থেকে। আমি দাঁড়ালাম। ওর খানিকটা শরীর দেখা যাচ্ছে। ও পেছন ফিরে আমাকে খুঁজছিল। আমার হাত অটোম্যাটিক উপরে উঠে গেল। ওর হাত ও দেখলাম ।

আমি দৌড়ে বের হোয়ে এলাম । আমি আর পারছিলাম না। বুকের ব্যাথা আমাকে পাগল করে তুলল । বাইরে এসেই দেখলাম যে ওর বর ওর জন্যে ফুলের তোরা হাতে নিয়ে ওয়েট করছে। ও আমাকে ওর বরের ছবি দেখিয়েছিল হোটেলের রুমে। সে আমাকে চিনত না। মনে হয় যেহেতু আমি ছিলাম শেষ যাত্রী সেজন্যেই বোধ হয় আমাকে জিজ্ঞেস করল,” এক্সকিউজ মি, আপনি কি এই মেয়েটাকে দেখেছেন ? বলে ওর একটা ছবি আমাকে দেখাল। “ আমি বললাম,” হ্যাঁ, আমি দেখেছি উনাকে। উনি এখনো ইমিগ্রেশনে আছেন। ডোন্ট ওয়রি, উনি সময় মতোই আসবেন।“ আমি তার মুখে নিশ্চিন্ত হবার ছায়া দেখতে পেলাম।

আমি ওই জায়গা থেকে বের হোয়ে এলাম। একটা বিরাট শুন্যতা আমাকে মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ধরল । হাজারো মানুষের মাঝেও আমি নিতান্তই একলা হোয়ে গেলাম। কিভাবে কাটবে ওর পর্বত সমান জীবন ? কিভাবেই বা বাঁচব আমি। অথছ আমি মাত্র ১৫ মিনিট আগে ওকে ছেড়ে এসেছি। আমার পা সামনে এগুচ্ছিলনা। এত শুন্যতা, এত একেলা ফিল হওয়া, এত অসহায় আমি কখনো অনুভব করিনি।

আমি অলরেডি ওকে মিস করছি। আমার হৃদয়টা ওর কাছে বাঁধা পরে আছে। কিভাবে একজন মানুষ আর একজনকে এতো ভালোবেসে ফেলতে পারে মাত্র ক’দিনের মধ্যেই। ? আমি জানি না ।।আমি জানিনা। শুধু আর একবার ওকে দেখতে চাই। শেষ বারের মতো প্রান ভরে দেখে নিতে চাই আমার সোনাকে যাকে আর কোনদিনই হয়তো দেখতে পাবনা।
আমি ৪ নম্বর টার্মিনালের দুই নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমি জানতাম যে ওর বর এখন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে ১ নম্বর গেট অনেক কাছে তাই স্বাভাবিক ভাবেই ওই দিক দিয়েই টারমিনাল থেকে বের হবে। আমি ২ নম্বর গেটের কাছে এমন জায়গায় বসে রইলাম যেখান থেকে ও বের হোয়ে এলে আমি দেখতে পাব। আমি বসে বসে দেখছিলাম যে ওর স্বামী এক গোছা ফুল আর ওর ছবিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বসে বসে ভাবছিলাম যে কিভাবে এই জার্নিটা আমাদের দু’জনেরই জীবন চিরদিনের জন্যে বদলে দিয়েছে। আমি কিভাবে বিবাহিত থাকা স্বত্যেও আর একজন মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। তার সাথে স্বপ্নের মতো একটা সপ্তাহ কাটালাম। সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মনে হবে যে এটা পরকিয়া প্রেম কিন্তু আমিতো জানি যে এটা পরকিয়া না। গত ক’দিনের মুহূর্তগুলো মুভির মতো আমার চোখের সামনে দিয়ে ফ্ল্যাশ ব্যাক হ’তে লাগল। কখন যে চোখ ভরে গেছে অস্রুতে বুঝতে পারিনি। আমার দু’টো হাত আমি আমার মুখের উপরে দিয়ে চুপ করে বসে রইলাম। আমি চাইনি যে কেউ আমাকে দেখুক যে আমি কাঁদছি। আমি কাঁদছি যার জন্যে যে কিনা আর কোনদিন আমার পাশে থেকে আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখবে না।

একসময় দেখলাম যে ও বের হোয়ে আসছে । ওর বর ওর দিকে ছুটে গেল। সে তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরতে গেল কিন্তু ও তার দিকে এক নজর উঠিয়ে তাকিয়েও দেখলনা। আমি দেখছিলাম যে ওর চোখ স্ক্যান করছে ডানে বাঁয়ে সব দিকে । ওর বর ওকে ফুল দিল কিন্তু ও ছুঁয়েও দেখল না। বেশ ক’বার চেষ্টা করার পর ও ফুলের গোছাটা হাতে নিল ঠিকি কিন্তু ওর বরের দিকে তাকানোর প্রয়োজনিয়তা বোধ করলনা। শেষ পর্যন্ত ও আমাকে দেখল।

ও যেন জানতোই যে দুনিয়া উলটে যায় যাক কিন্তু আমি ওকে শেষবারের মতো একবার দেখার জন্যে অপেক্ষা করবই। ওর বর ওর হাত ধরে ১ নম্বর গেটের দিকে আগাতে চাইল কিন্তু ও এক ঝটকায় তার হাত থেকে বের হোয়ে ট্রলি নিয়ে সোজা আমার দিকে আসতে লাগল। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে আমার কি করা উচিৎ। আমার মনে হোল যে আমি ফ্রোজেন হোয়ে গেলাম। সময় থেমে গেল। আমি দেখলাম ও সোজা আমার দিকেই আসছিল। যে কোন লোক দেখলেই বুঝতে পারবে যে ও কার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। “ হে খোদা তুমি মাটিটাকে দুই ভাগ করে দাও আর আমি ঢুকে পড়ি ভেতরে ।

কি হবে যদি ও কোন সিন ক্রিয়েট করে ? আমি কিভাবে সামলাবো ওকে।? প্রার্থনা করছিলাম যাতে ও ওর সেন্স ফিরে পায় আর চুপ চাপ কিছু না বলে চলে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *