লাভ ইন ওমান – 31

যেদিন তোমার বরের সাথে তোমার প্রথম রাগারাগি হবে তুমি প্রথমে যে কাজটি করবে তা হোল আমাকে কল করে বসবে। আর তা যখন করবে তখন আর পেছনে ফিরে দেখা হবে না আমার। তোমার ডাক উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই সেটা তুমি ভালো করে জান।“ ও আমার বুকের উপরে উঠে বসে আমাকে আঘাত করতে লাগল । আমি নিরবে সয়ে গেলাম।
” কেন, কেন তুমি আমার জীবনে এলে আর এলেই যদি তবে কেন আমাকে এত ভালোবাসলে ? আমাকে শেখালে যে ভালোবাসা কিভাবে করতে হয়। কেন আমাকে এত ভালোবাসলে ? আর কেনই বা তুমি এখন গড সেজে আমার ভাগ্য লিখছ ? ভাগ্যই যদি লিখবে তবে কেন তোমাকে আমার ভাগ্যের সাথে জুড়ে দিলে না ? কেন ? কেন “? ও জোরে জোরে চিৎকার করতে লাগল। আমার কাছ থেকে উঠে গিয়ে অন্য সিটে গিয়ে বসে দুই হাত মুখের উপরে দিয়ে কাঁদতে লাগল । আমি ভয় পেয়ে গেলাম যে ফাতিমাহ যদি এসে পরে তখন কি বলব।

এক সেকেন্ডেই ফাতিমাহ এসে হাজির। দৌড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল যে কি হোয়েছে ? আমি বললাম,” ও নেক্সট ঈদ উল ফিতরের সময় ওর বাবা মার সাথে ঈদ করার জন্যে বাংলাদেশে যেতে চেয়েছে আর আমি জোক করে বলেছি যে আগামি ১০ বছরও দেশে যেতে পারবে না তাই সে কান্না শুরু করে দিল।“
আমি ফাতিমাহ র মুখ দেখে বুঝতে পারলাম না যে সে কি আমার কথা বিশ্বাস করল বা না করল। তবুও এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,” ডোন্ট ওয়রি, হি ওয়াজ জোকিং।“ তারপর চলে গেল

আমি দাঁড়িয়ে দুই হাত ওপেন করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম । ও দৌড়ে চলে এসে আমার বুকে মুখ লুকাল ।“তুমিতো জান যে তোমার ডাক উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই।“ আমি ওকে নিয়ে শেষবারের মতো শুয়ে রইলাম ওকে বুকে করে। আমি ওর কপালে, ঠোঁটে, বুকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিলাম। তখন তাকে ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের রুলসগুলো বললাম। ওর ডিস-এম্বারকেশন ফর্মটা ফিল্ আপ করলাম।

Amazing-Love-Quotes1-e1415828617155

আমাদের ফাইনাল খাবার নিয়ে এল ফাতিমাহ। আমি ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দিলাম বুকের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। ও আমাকেও খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষে ও আমাকে একটা ছোট কাগজের টুকরা হাতে দিয়ে বলল যে ওর নাম লিখে দিতে। আমি ভেবেছিলাম যে ও আমার ঠিকানা আর ফোন নম্বর চাইবে।

আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলল,” এই কাগজটার উপরে আমার নাম লিখে দাও। “ আমি বললাম,’ নাম লিখে কি করবে ?” ও বলল,” আমাদের কোন ছবি নেই। তোমার কোন ঠিকানা আমাকে দিলে না, ফোন নম্বর দিলে না। আমাদের আর কোন স্মৃতি আমি আমার সাথে নিয়ে যেতে পারবনা তোমার ।

এই কাগজে তোমার হাতের লিখাটাই হবে আমার একমাত্র ভালোবাসার স্মৃতি যাকে আমি চোখ দিয়ে দেখতে পারব, ছুঁতে পারব , চুমু দিতে পারব। আমাকেতো কোন কিছু নিয়ে বাঁচতে হবে তাইনা ? তোমার হাতের লিখাতে আমি চুমু দেব, আদর করব আমার সাথে আমি আমৃত্যু রাখব। আর আমার নাম সেজন্যে কেউ কোন কিছু সন্দেহ করবে না।“ আমি বললাম, “স্মার্ট, ভেরি স্মার্ট।“

ঠিক তখনি আমি আমার হাতব্যাগ থেকে বের করে দিলাম সেই লকেট যার মধ্যে ও রাখতে পারবে ওর নামটাকে। আমি ওর গলায় পড়িয়ে দিলাম। ও অবাক হোয়ে আমার দিকে তাকাল। এক দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে দেখে আসল আর এসেই আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পরল। ‘তুমি কখন ওটা কিনেছিলে ? আমিতো তোমার সাথেই ছিলাম।? আমি বললাম,” মনে আছে সেই যে আইস্ক্রিম যখন গলে গেল সেই সময়ে।“

আমি খেয়াল করলাম যে ও ডায়মন্ড বা গোল্ডের দিকে কোন নজরই দিলনা। ও বার বার চুমু দিতে লাগল লকেটটাতে। আমি গলা থেকে খুলে লকেটটা ওপেন করলাম পেছন দিক থেকে । তখন ও আরো অবাক হোল। আমি ওর নাম লিখা ছোট্ট কাগজটা ভাঁজ করে ছোট্ট করে ওটার ভেতরে ভরে লক লাগিয়ে দিলাম। ওর খুশি দেখে কে। ও মাই গড।। একেবারে পারফেক্ট হোয়েছে।

এখন আর কেউ কিছু বলতে পারবে না। আমি সারা জীবন এটাকে আমার গলায় রাখব । এর চেয়ে ভালো কিছু হ’তেই পারেনা। আমাকে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল। আমি বললাম,” এই যে আমার লিখাটা সেটাকে একটা প্লাসটিকক দিয়ে মুড়িয়ে নিও এতে জল ঢুকতে পারবেনা। “ ও মাথা নেড়ে সায় জানাল।

ওর চোখ আবার অস্রুতে ভরে উঠল। বলল,” কি ভাবে তুমি এতো কিছু খেয়াল রাখ ? কি ভাবে ছোট ছোট ব্যাপারগুলো তোমার চোখ এড়িয়ে যায়না ? কে আমার জন্যে এতকিছু খেয়াল রাখবে।? গত কটা দিন তুমি আমার খেয়াল রেখেছ। আমাকে বুঝতেও দাওনি কিছু। আমার আরাম, আমার একটু ভালো লাগবে, আমার মন ভাল হয়ে যাবে এসব কিছু তুমি আমার জন্যে করেছ। আমার জানা নেই যে কোন স্বামী তার স্ত্রীর জন্যে এতটা করে কিনা । তুমি আমাকে পাখী যেভাবে মুখের ভেতরে খাবার নিয়ে তার বাচ্ছাদের খাওয়ায় তুমি ঠিক তাই করেছ । আমাকে বল যে আমি কিভাবে এগুলো ভুলে যাবো? কেন এত কঠিন তোমাকে ছেড়ে যাওয়া? কেন? কেন?

তুমি জান যে আমি সারাটা জীবন তোমার কথা মনে করে যাব। আমার সকাল শুরু হবে তোমাকে চুমু দিয়ে আর শেষ হবে রাতে তোমাকে চুমু দিয়ে। তোমাকে চুমু দিতে পারলে আমি বেঁচে থাকার শক্তি পাব।। এই যে ছোট ছোট জিনিসগুলো তুমি খেয়াল কর আমার মনে হয় এমনটা করে খুব বেশি মানুষ নেই দুনিয়াতে। ভালোবাসা প্রমান করানোর জন্যে অনেক টাকা খরচ করার দরকার হয়না। ছোট ছোট জিনিস দিয়েই বোঝা যায় যে কে কতোটুকু ভালোবাসে। “

মনে হোল ও ওর শেষ শক্তি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল,” আচ্ছা কোনই কি উপায় নেই যে আমরা এক সাথে থাকতে পারি? তুমিতো ৪ বিয়ে করতে পার। তাহলে আমাকে সেকেন্ড স্ত্রী হিসাবে নিতে পারনা ? আমি তোমার ওয়াইফের কাছে কোনদিন কিছু চাইবনা। শুধু আমাকে তোমার কাছে থাকতে দিলেই হবে। আমি তার সেবা করব। আমি তাকে কোন না কোন ভাবে রাজি করাতেই পারব যাতে সে আমাকে তার ছোট বোন হিসাবে মেনে নেয়।“

আমার বুক ফেটে গেল তবুও মুখে আমি বললাম, “তুমি নিজেই জান যে সেটা সে মেনে নেবেনা। কোন মেয়েই সেটা মেনে নেবে না। ভাব দেখি আজ আমি যদি তোমার জন্যে একজনকে ছেড়ে যাই তাহলে কাল তার কি গ্যারান্টি আছে যে আমি আর কারো জন্যে তোমাকে ছেড়ে যাবনা ? আমি জানি তুমি আমাকে স্বার্থপর ভাবছ।“ আমার মুখে ওর হাত দিয়ে চাপ দিয়ে ধরল,”না ওটা বলবে না, তোমার মতো সেলফলেস আর কেউ নেই। আমি যদি সত্যি তোমার চোখের ভাষাকে পড়ে থাকি তবে আমি জানি তোমার কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে।

আমি তোমার চোখে আমার জন্যে সত্যিকারের ভালোবাসা দেখেছি। আমাকে তুমি সত্যি কথা না বলে ইজিলি আমাকে নিয়ে খেলতে পারতে কিন্তু তুমি তা করনি। ? তুমি প্রথম থেকেই সত্যি কথা বলেছ। কোনকিছু লুকাওনি। আর মনে হয় সেজন্যে ওই আমি তোমার উপড়ে মরছি। আচ্ছা, শুনেছি যে কেয়ামতের দিন আমরা আবার সব হাশরের ময়দানে মিলবো। তুমি কি আমাকে চিনতে পারবে ওই লক্ষ কোটি মানুষের মাঝ থেকে ?

আমি কিন্তু তোমাকে ঠিকই চিনতে পারব। তোমার এতো ছোঁয়া আর তোমার শরীরের গন্ধ আমি প্রানভরে নিয়েছি যে আমি তোমাকে না দেখেও ঠিকই খুঁজে বের করতে পারবো । আমাকে যদি খোদা বলে যে আমি কি চাই। আমি বলব যে আমি তোমাকে চাই । খোদা যদি বলে যে উনি সেটা মিন করেন নি। উনি মিন করেছেন যে আমি দোজক চাই না বেহেস্ত চাই । আমি তখন জোর গলায় বলব,” যে খোদা আমি ঠিকই বুঝেছি আর বুঝেই উত্তর দিয়েছি, ওর সাথে থাকাই আমার জন্যে বেহেশত আর ওর সাথে না থাকাই আমার জন্যে দোজক ।“

আমি ওর কথা শুনছিলাম। এত ভালোবাসা আমার জন্যে ওর মনে কোথা থেকে এলো । আমি কোন হিসাব মেলাতে পারলাম না যে কিভাবে সম্ভব এতোটা ভালোবাসা । আমি প্রার্থনা করতে লাগলাম যাতে ও শক্তি পায় বাস্তবটাকে সামনা করার। কি হবে যখন ওর স্বামীর সাথে থাকা শুরু করবে ?” আমার চিন্তা করার শক্তি মনে হোল লোপ পেয়েছিল । আমি আসলেই এক অপরাধী। জঘন্যতম অপরাধী । মানুষের শরীরটাকে খুন করলে তার শাস্তি আছে কিন্তু মানুষের মন খুন করার শাস্তি কেন হবে না ?

সিটবেল্ট বাঁধার সময় চলে এল। ফাতিমাহ এসে আমাদের থ্যাংকস বলে গেল। সাথে নিয়ে এল কিছু গিফট। আমি সব ওকে দিয়ে দিলাম। ও কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আমি কি করব ওসব নিয়ে। আমারতো কোন জিনিসে বিন্দুমাত্র লোভ নেই। তুমি নিয়ে যাও। শুধু আমাকে ভিক্ষে হিসেবে তোমাকে দিয়ে যাও । দুনিয়াতে আমার শুধু তোমার উপরেই লোভ সোনা। আমি আর কিছুই চাইনা “ বলে আমার দিকে ছোট্ট গিফটগুলো পুশ করে দিল। আমি খেয়াল করলাম যে ও লকেটটা ধরে আছে।

ফাতিমাহ চলে যেতেই ও সিটবেল্ট খুলে আমার কাছে চলে এল। দুজনে একসাথে শেষবারের মতো বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম। ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম গভীর মমতা দিয়ে। বুকের পাঁজর ভেঙে গেল চিন্তা করতেই যে আর মাত্র ক’মুহূর্ত ওকে পাব। আমার বুকের সাথে মিশে রইল আর আমার শার্টের বোতাম খুলে আমার গন্ধ নিতে লাগল।

জীবনে যা কিছু শুরু হয় তা এক সময় শেষ হয়।

৭ দিন আগে আমাদের জার্নি শুরু হোয়ে ছিল আর শেষ পর্যন্ত আমাদের জার্নি শেষ হোল। আর এই ৭ দিনে আমাদের জীবনটা চিরদিনের মতো পালটে গেছে। ঢাকা এয়ারপোর্টে সামান্য হাই দিয়ে যে সম্পর্কের সূচনা হোয়ে ছিল আজ সেই সম্পর্কের ইতি টানা হোয়ে গেল কান্না দিয়ে । যে সম্পর্কটা শুরু হোয়েছিল পাশাপাশি বসে সেই সম্পর্কটা শেষ হয়ে গেল একের ভেতরে অন্যকে ধারণ করে। কিভাবে ওকে ছাড়া আমার আর আমাকে ছাড়া ওর প্রতিদিনের জীবন চলবে ? আদৌ চলবে কি ? জানিনা ।

প্লেন জে এফ কে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। ও আমার সাথে আমার সিটেই বসে রইল। প্লেন থামার পর ওকে বললাম,” সোনা, যদি আরও অনেক দূরে যাওয়া যেত তা’হলে চলে যেতাম তোমার হাত ধরে। চল, এবার নামতে হবে।“ ওর হাত ধরে টান দিয়ে ওকে সিটের উপর থেকে ওঠানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ও উঠলো না। প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রাখল দুই হাত দিয়ে। এবার আমি ওকে দুই হাত দিয়ে বুকের উপরে ভর দিয়ে টেনে উঠালাম। দু ‘চোখ ভরা চোখের জল টপ টপ করে আমার হাতের উপড়ে পড়তে লাগল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *