লাভ ইন ওমান -২৬

ফ্রন্ট ডেস্ক এর সামনে ইরাকি এয়ারওয়েজের সেই অফিসার দাঁড়িয়ে ছিল। আমাদের দেখেই এগিয়ে এল। আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল দেখলাম যে বালানস একেবারে যিরো। আমাদের জিজ্ঞেস করল যে এখানে থাকাটা কেমন লাগল । অনেক অ্যাপোলজী করল যে আমাদের ক’দিন এখানে থাকতে হোল বলে। ইরাকি এয়ারওয়েজ আমাদের এত ভালো কেয়ার করেছে যে অভিযোগের কোন সুযোগই রাখেনি। আমি ও যতটুকু পারলাম তাদের এক্সট্রা অরডিনারি সার্ভিসের জন্যে থ্যাংকস জানালাম।

হোটেল থেকে যখন বাইরে এলাম তখন বাইরের তাপমাত্রা ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো । হিউমিডিটি একেবারেই ছিল না সেজন্যে গরম লাগছিলনা । আমি খুঁজছিলাম সেই ড্রাইভারকে। আমাদের দেখতে পেয়েই দৌড়ে এল। আমি সেই ইরাকি এয়ারওয়েজের অফিসারকে বললাম যে আমরা কি তার সাথে যেতে পারি। আমাকে বলল যে ইরাকি এয়ারওয়েজ আমাদের জন্যে সব ব্যবস্থা করেছে সেজন্যে আমাদের তার সাথেই যেতে হবে। আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারের জন্য খারাপ ফীল করলাম ।আমি কিছু ডলার দেবার চেষ্টা করলাম কিন্তু উনি খুব বিনয়ের সাথে রিফিউজ করলেন কারণ উনি আমাদের জন্যে কোন সার্ভিস দেন নি আজ। উনার নীতিবোধ ভালো লাগল। ।

আমাদের জন্যে আনা একটা বড় ভ্যানে আমাদের লাগেজ উঠিয়ে সেজা এয়ারপোর্টের দিকে ছুটে চললাম আমরা। গুড বাই মাস্কাট, গুড বাই ওমান। ইরাকি এয়ারওয়েজ আমাদের জন্যে এত কিছু করেছে যে আমরা থ্যাংস জানানোর কোন ভাষা পেলাম না। আমাদের গালফ এয়ারের কাউনটারে নিয়ে গেল সেই অফিসার। আমি অবাক হোয়ে খেয়াল করলাম যে পুরো এয়ারপোর্ট একেবারে ফাঁকা।। কোন কাউনটারেই কোন লোক নেই শুধু গালফ এর কাউনটারে ক’জন লোক। চারিদিকে কেমন যেন একটা গুমোট ভাব ফীল করতে পারলাম। কিছু একটা হোয়েছে এটা নিশ্চিত ।.

টিকেট এজেন্টকে জিজ্ঞাশা করতেই বলল যে আমরা সহ মাত্র ১৫ জন পাসেঞ্জার। পুরো মিডল ইষট প্রায় সব এয়ারলাইন্সের গত ক’দিন ধরে সব ফ্লাইট ক্যানসেল করেছে। আস্তে আস্তে নরমাল হবে ।
আমি ইরাকি এয়ারওয়েজের সেই অফিসারকে বললাম যে আমরা নিওলি ম্যারীড। যদি সম্ভব হয় তবে আমাদের যেন দুইটা বেটার সিট দেয়া হয়। ইরাকি এজেন্ট গালফ এয়ারের এজেন্টকে কি যেন বলল আরবিতে। তার মুখে একটা মিষ্টি হাসির রেখা দেখতে পেলাম। আমাদের বোর্ডিং পাসের পেছনে আরবিতে কি যেন লিখে দিয়ে একটা সীল মেরে দিল আর আমাকে বলল যে প্লেনে ঢোকার সাথে সাথে যেন আমি দেখাই এয়ার হোসটেসকে। আরও বলল যে চিন্তার কিছুই নেই উনি ভেতরে যেয়ে সব ব্যবস্থা করবে ।

আমি ইরাকি এয়ারওয়েজের এজেন্টকে অনেক অনেক থ্যাংকস জানালাম আমাদের এত হেল্প করার জন্যে।এজেন্ট আমাকে উইশ করে হ্যাণ্ডশেক করে আমাকে জড়িয়ে ধরল ক ‘সেকেনডের জন্যে । আর ওর সাথে খুব বিনয়ের সাথে হ্যাণ্ডশেক করল।

আমরা সিকিউরিটি স্কানিং আর চেকিং এর পর যখন ভেতরে গেলাম তখন আমি পে ফোন দেখে বললাম তার বরকে ফোন করার জন্যে । আমার কাছে ফোন কার্ড ছিল। প্রথম বার যখন ওর মার সাথে কথা হয় তখন ওর কাছে ওর বরের নাম্বার ছিলনা। ওর মা ওকে নাম্বার দেয় যেটা আমি লিখে নেই। আমি আমার নোটবুক থেকে সেই নম্বরটা বের করে বললাম,” কল কর প্লিজ। তোমার বর নিশ্চিত তোমার কল না পেয়ে এতদিন একেবারে মাথা খারাপ হোয়ে গেছে তার।

গত ক’দিনে আমি বলেছি দুই তিন বার কল করার জন্যে কিন্তু ও কল করেনি। বার বার বলেছে যে পরে কল করবে কিন্তু সে পরে আর কখনো আসে নি। ও কল করেনি। আমি ওর বরের নম্বর পুশ করে ওপারে রিং হওয়া মাত্রই আমি ওকে দিয়ে দেই। ও শুধু এয়ারলাইনের নাম আর ফ্লাইট নম্বর দিল।তেমন কোন কথা বলল না ও।
আমি বুঝতে পারছিলাম যে ওর বর জানতে চাচ্ছিল যে ও কেন গত ক’দিনে কল করেনি। ও শুধু বলল যে ও জানত না যে কিভাবে কল করতে হয়। ও ভালোই ছিল। একটা বাংলাদেশি ফ্যামিলির সাথেই পাশা পাশি রুমে ছিল। আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও হাং আপ করল। আমি এই ভেবে নিশ্চিন্ত হোলাম যে ওর বর ওকে নিতে আসবে।

আমরা হাঁটছিলাম আমাদের হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে। ও বার বার পেছন ফিরে দেখছিল। মনে হোচ্ছিল যে ওর হার্ট এই ওমানে রেখে যাচ্ছে। চোখ থেকে টপ টপ করে অস্রু পড়ছে। ওকে আমি অনেকটা টেনে নিয়েই এগুচ্ছিলাম। প্লেনের ভেতরে এসে আমি আমাদের বোর্ডিং পাস দু’টো হাতে দিলাম এয়ার হোসটেঁসের। আমাদের সিট দেখানর আগেই আমি বললাম যে অপরদিকে আরবিতে লিখা কথাগুলো পড়ার জন্যে ।

মুহূর্তের মধ্যে এয়ারহোসটেসের চেহারায় ফুটে উঠল একটা রহস্যময় আর দুষ্টুমি র হাসি। আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বলল। আমি ভাবছিলাম যে কি লিখা আছে আরবিতে। ও আমাকে একি কথা জিজ্ঞেস করল। আমি বলতে পারলাম না। দুই মিনিটের মধ্যে ই এয়ার হোসটেস এসে আমাদের তাকে ফলো করতে বলল।

আমাদের বিজনেস ক্লাস পার হোয়ে সোজা উপরের সিঁড়ি বেয়ে জাম্বো জেটের ফার্স্ট ক্লাসে নিয়ে গেল। আমি কোনদিনই ফার্স্ট ক্লাসএ জার্নি করিনি। বেশ ক’বার বিজনেস ক্লাস এর আপগ্রেড পেয়েছিলাম। ৭৪৭ প্লেনের আপার ডেকে যখন আমাদের নিয়ে এল সেখানে কেউ ছিলনা। এমনকি বিজনেস ক্লাসেও কোন যাত্রি ছিলনা। আমরা একেবারে নির্জন একটা জায়গায়। এত নির্জন যে অনেকটা ভয়ের। মনে হয় যে কেউ কোথাও নেই। আমার ধারনার বাইরে ছিল যে ইরাকি এয়ারওয়েজের লোকজন আমাদের জন্যে এত কিছু করবে।

এয়ারহোসটেস আমাকে বলল যে যে কোন দু’টো সিট আমরা বসতে পারি। আর আমাকে আস্তে করে কানে কানে বলল,” ইচ্ছা করলে একই সিটে তোমারা বসতে পার, শুতে পার। কেউ কোন ডিসটাব করবেনা।“ বলে আমাকে চোখ মেরে দিল সেই দুষ্টুমি হাসি দিয়ে। আমার তো মাথা খারাপ হোয়ে গেল যে কি বলে… এর নাম তাহলে ফার্স্ট ক্লাস ? আই লাভ দি এয়ারহোসটেস।

couple22

ওমানি সময় সকাল ১১.৩০ র দিকে প্লেন আকাশে উড়ল। জানালা দিয়ে দেখছিলাম। ও আমাকে শক্ত করে ধরে বসে আছে ।আমি ওকে বললাম,’’ যতদিন বেঁচে আছি ততোদিন গতো ৫ দিনের কথা মনে রাখব । ওমানের কথা, মাস্কাটের কথা।“ আমিও, চোখ ভরা অস্রু নিয়ে বলল। আচ্ছা একটা কথা বলতো, আমার হাত এত জোরে ধরে রাখ কেন।?” হেসে বললাম । ‘যাতে কেউ কোনদিন তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে না পারে।‘
কিন্তু সোনা আর মাত্র ক’টা ঘণ্টা। তারপরই তো দু’জনেই দু’জনের উলটো দিকে হাঁটবো। তোমার বুক থেকে আমি আর আমার বুক থেকে তুমি চলে যাব চিরদিনের মত।“ আমি ওর মুখের উপরের চুল সরিয়ে বললাম।

মনে হোল একটু রেগে গেল। এই প্রথম আমি ওকে রাগতে দেখলাম,”আহ, তুমি কি থামবে ? আমাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ? কেন আমাকে মরে যাবার আগেই মেরে ফেলছ সোনা।?” আবার ওর শাইনি চায়নিজদের মতো করে কাটা চুলের ভেতরে আমি আমার হাত ঢুকিয়ে দিলাম।
ও ওই প্রথম ছোট ঘাড় অব্দি চুল করেছিল। ওর জন্যে একেবারেই নতুন একটা অভিজ্ঞতা। ও জানতোই না যে ছোট চুল কিভাবে মানেজ করতে হয়। আসলে ছোট চুল ম্যা্নজ করতে হয় না। ও অবাক হোয়ে বলল,” ছোট চুলের যে এত মজা আগে জানলে কোনদিনই লম্বা চুল রাখতাম না।“ তখন জানালা দিয়ে দেখছে ও…মনে হোচ্ছে শেষ শক্তি দিয়ে ও দেখতে চাইছে ওর ফেলে আসা স্মৃতি গুলোকে । বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে দেখেছে আস্তে আস্তে ছোট হোয়ে যাওয়া শহরটাকে ।

প্লেন লন্ডনের দিকে উড়তে শুরু করল। পাইলট আমাদের জার্নির সংক্ষেপে একটা বর্ণনা দিল যে ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর আমাদের প্লেন পৌঁছবে লন্ডনের হিথ্র এয়ারপোর্ট। আমরা ৪২০০০ ফিট উপর দিয়ে প্রায় ৫০০ মাইল স্পীডে উড়ে যাবো। একই প্লেন আমাদের নিয়ে যাবে ফাইনাল ডেসটিনেশন নিউইয়র্ক । লন্ডনে এক ঘণ্টার যাত্রা বিরতি। আমি হিসাব করে দেখলাম যে ১৬ ঘণ্টা আমরা এক সাথে থাকতে পারব। কিছু বললাম না তাহলে হয়তো এক্ষুনি কাদঁতে শুরু করে দেবে।

আমরা ডান দিকের একেবারে পেছনের সিটটা নিয়েছিলাম কারণ আমি জানি যে বাঁ দিক দিয়ে এয়ারহোসটেস আমাদের জন্যে খাবার বা অন্য কিছু নিয়ে আসবে তাই ডান দিক হোল সবচে’ নিরিবিলি । একটু পর সেই দুষ্ট এয়ারহোসটেস বুকের ওপরে নেমপ্লেটএ লিখা আছে আরিযা এসে হাজির সাথে ট্রে ভরা চীজ, বিস্কিট,জুস, জাম্বো সাইজের শ্রিম্প কক টেল, নিয়ে দারুণ সাদা টেবিল কভার, গোল্ডেন চামচ, কাঁটা চামচ এক এলাহি কারবার।

আমাদের একি সিটে দু’জন বসা দেখে মুস্কি হাসি দিয়ে বলল,” কি বাপার ? একেবারে সবচেয়ে নিরিবিলি জায়গাটা বেছে নিয়েছ। মনে হয় তুমি রেগুলার ফার্স্ট ক্লাস জার্নি কর। ‘’আমি এমন ভাব করলাম যেন এটা কোন ব্যাপার না । আমার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলল,” ডোন্ট ওয়রি লাভ বার্ড। কেউ তোমাদের ডিস্টার্ব করবেনা।

পাজি এয়ারহোসটেস চলে যাবার পর আমি ওকে বললাম,” মনে হয় একটা গুড নিউজ আছে। প্রথমতো আমাদের যেহেতু প্লেন বদলাতে হবে না সেহেতু আমার মনে হয় আমরা শেষ পর্যন্ত এখানেই থাকতে পারব। দ্বিতীয়ত প্রতিটা সিট ৮/৯ হাজার ডলার খরচ করে মনে হয়না যে ফার্স্ট ক্লাসের ১৬ তা সিট ভরবে। তাছার বিজনেস ক্লাসের ৩৬ টা সিট না ভরে ফার্স্ট ক্লাস ভরবেনা। ও খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরল আর বলল,” তুমি কিভাবে এত কিছুর হিসাব রাখ। মনে হয় সব ইনফরমাশন তোমার মাথায় ভরা।“

Ariza

আমাদের জন্যে স্পেসালি আরিযা থাকবে। খুব বন্ধুর মতো আরিযার ব্যাবহার। আমি আরিযাকে বললাম,’ আরিযা ফ্রেন্ড, প্লিজ একটু দেখনা যে লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত কি আমাদের এই সিট দু’টো সেফ কিনা। স্মার্ট আরিযা একবারেই বুঝে গেল যে আমি কি বলতে চাচ্ছি।। আসছি বলে চলে গেল আরিযা, ৪/৫ মিনিট পরেই এসে হাজির ফুল ইনফরমেশন নিয়ে। “আমি আগেই জানতাম যে লন্ডন থেকে কোন ফার্স্ট ক্লাস যাত্রী নেই।

বিজনেস ক্লাসে মাত্র ৪ জন। সো তোমাদের লাভ বার্ডের কোন প্রাইভেসী নষ্ট হবে না। কেউ ডিস্টার্ব করবেনা। তোমারা এম্পটি রুমের অ্যাডভানটেজ নিতে পার। আমি আছি তোমাদের সাথে। আর ফ্রেন্ড যখন বলেছ তখন তো আমার আর দায়িত্ব বেড়ে গেল যে ফ্রেন্ড আর ফ্রেন্ড বউকে খুশি করতে হবেনা?” আমি আরিযাকে অনেক থ্যাংস জানালাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *