লাভ ইন ওমান -২৫

রুম সার্ভিস থেকে রাতের খাবার আনিয়ে খেলাম। তখন কি জানতাম যে কাল এ আমাদের চলে যেতে হবে এই স্বপ্নের রুম থেকে।? পরম যত্নে ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দিলাম। কেমন যেন এক দলা কষ্ট আমার বুকের মধ্যে জমা হোয়েছিল। আমাকে রিতিমতো অসুস্থ করে তুলল। কিছু খেতে ভালো লাগলনা । আমি ওকে বুকের ভেতরে নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চলে গেলাম।
বিছানায় শুয়ে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে রইল। “ সোনা, তুমি কি পারবে আমাকে ছাড়া থাকতে ? “ আমি বললাম, “ হায়রে, তোমাকে বোঝাতে যেয়ে কে জানত যে আমার হৃদয় ভেঙে খান খান হোয়ে যাবে। তোমাকে সাহস জোগাব না আমি নিজে সাহস পাব ? জানিনা সোনা যে আমার কি হবে । আচ্ছা ধর কোনদিন তুমি শুনতে পেলে বা নিউইয়র্কের বাংলা পেপারে দেখতে পেলে যে আমি মরে গেছি তখন তুমি কি আমাকে মনে করে কাঁদবে ?”

on the floor

এবার ও হেসে দিল। আমার বুকের উপরে উঠে বসে বলল,” শোনেন জনাব। আপনার মাত্র ২৭ বছর বয়স। আপনার মারা যেতে আর ৫০ বা ৬০ বছর বাকি আছে। কথা হোল যে ততোদিন আমি বেঁচে থাকব কিনা।“ সেজন্যে এই প্রসঙ্গ বাদ।“
দুইজনেই একি সাথে ঘড়ি দু’টো পরলাম। পাশাপাশি হাত রেখে দেখলাম যে দারুণ লাগে। একেবারে মানিয়ে গেছে আমাদের হাতে। ওর ফর্শা নির্লোম হাতের পাশে আমার হাত দেখে মনে হোল যে পারফেকট ম্যাচ। “ আমি এই ঘড়ি খুব কম পরব যাতে সহজে না নষ্ট না হোয়ে যায়। এমনকি খারাপ হোয়ে গেলেও আমি পরব প্রতি বছর এই সময়টাতে তোমার আমার এই হোটেলের এই ভালোবাসার কথা মনে করে। কথা দাও তুমি তাই করবে। তাহলে আমরা দু’জনেই জানব যে আমরা দু’জনেই একই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি।“

Close up of woman crying

আমার গলা ধরে বলল,” এই একটু আদর করনা প্লিজ।“ আমি পাশ ফিরে ওকে টেনে নিলাম বুকের মাঝে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলাম ওর সারা শরীর। ক্লান্ত শরীরে পরিতৃপ্ত হোয়ে প্রায় আধা মরার মতো গভীর ঘুমের দেশে হারিয়ে গেছে সোনার মেয়ে। আমি বাথরুম থেকে এসে ওকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।
পঞ্চম দিন খুব ভোরে ইরাকি এয়ারওয়েজ থেকে কল এল। আমি লোকটার আওয়াজ শুনেই চিনে ফেললাম। তাকে অনেক থ্যাংকস জানালাম আমাদের এত ভালো করে টেক কেয়ার করার জন্যে । আমাকে বলল যে অনেক চেষ্টা করে গালফ এয়ারের একটা ফ্লাইট পাওয়া গেছে যেটা কিনা ৫ ঘণ্টা পৌঁছবে এখানে। আমাদের নিয়ে লন্ডন হোয়ে নিউইয়র্ক পর্যন্ত যাবে। আমাদের রেডি হ’তে বলা আর সে আমাদের জন্যে ফ্রন্ট ডেস্ক এ আসবে আমাদের এয়ারপোর্টে নিয়ে যেতে। আমরা সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে যেন রেডি থাকি ।

আমাদের কথার মাঝেই ও ঘুম থেকে উঠল। আমাকে কথা বলতে দেখে ও কোন আওয়াজ না করে আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল। যখন ও বুঝল যে আমাদের একটু পর এখান থেকে চলে যেতে হবে হটাৎ করে আমাকে ছেড়ে দিল। উপুর হোয়ে কাঁদতে শুরু করল। বোঝানোর অনেক চেষ্টা করলাম কিন্তু অঝরে কাঁদছিল ও। মনে হোচ্ছিল যে কে যেন ওর বুকের ভেতর থেকে ওর হৃদয়টা খুলে নিয়ে যাচ্ছে।

আমার চোখেও জল চলে এল। দু’জনে দু’জনকে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদে বুক ভাসালাম। কিন্তু এক সময়তো রেডি হতেই হবে। শেভ করলাম । ওর পায়ের হাল্কা লোমগুলো শেভ করে দিলাম এক টানে। পায়ের নখে যত্ন করে নেইল পলিস দিয়ে দিলাম। চকচকে সুন্দর নখ । ততক্ষনে রুম সার্ভিসের দেয়া অর্ডারটাও চলে এসেছে। ওর চোখ লাল, কান লাল, নাক লাল।। ফর্শা ট্র্যান্সপ্যারেন্ট গালের ওপর দিয়ে রক্ত চলাচল দেখা যাচ্ছিল ।

Bangla1

 

ব্রে্কফাস্ট শেষ করে ওকে সুটকেস গুছাতে হেল্প করলাম। একটাও শপিং ব্যাগ ও নিলনা যাতে বরের কাছে কোন আন্সার না করতে হয়। সবগুলো কাপড় সহ যা যা কিনেছিলাম গত বিকেলে সবগুলোর ট্যাগ, প্রাইস এসব ভালো করে ছিঁড়ে ফেলল যাতে কোন চিহ্ন না থাকে যে ও ওমান থেকে ওগুলো কিনেছিল। স্মার্ট মেয়ে।
সুকেটস গোছানর পর আমি বললাম,” চল শেষবারের মতো ভালোবাসার খেলায় মেতে উঠি।“ ও লজ্জায় লাল হোয়ে গেল । আমি দুষ্টুমি করে বললাম ,” ইস রে, কি লজ্জা, আদর খাবার সময়তো একেবারে আমাকে নিংরে খাও আর এখন মনে হয় কিছুই বোঝনা।? “ তুমি না এমন লজ্জা দিতে পার” বলে আমাকে বালিশ দিয়ে মারার চেষ্টা করতে লাগল ।

আমার উপরে উঠে বলতে লাগল ” আর বলেবে কোনদিন? ‘মাফ চাই বাবা… আর বলবনা। এক টান দিয়ে একেবারে বুকের মাঝে মিশিয়ে দিলাম। হারিয়ে গেলামদু’জন দু’জনায়।

শেষ বারের মতো যাকুজি রেডি করে বিছানায় ক্লান্ত ওকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে গেলাম বাথরুমে। তখনও ওর টায়ার্ডনেস কমেনি। যাকুজির পাশেই ও ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ক’ফোঁটা জল ওর মুখের উপরে ফেলতেই ও বলল,” কোথায় আমি ? ওর এক পা টেনে জলে লাগাতেই ও লাফ দিয়ে উঠল।
আমি বললাম,” ভালো করে শেষ বারের মতো দু’জন দুজনকে গোসল করিয়ে দেই। “জল তে নেমেই ওর ঘুম চলে গেল। আমার উপরে বসে রইল আমাকে ধরে। ওর পিঠের উপরে গরম জলের স্প্রে ওর সব ব্যাথা আর টায়ার্ডনেস কমিয়ে দিল।

শাওয়ার শেষে যখন মুছে দিচ্ছিলাম তখন আমাকে ও জিজ্ঞেস করল, “ কিভাবে সম্ভব যে একটা লোক এত কিছু খেয়াল করতে পারে। এত ভাবে ভালোবাসতে পারে। তোমার এই ছোট ছোট জিনিসের প্রতি খেয়াল দেয়া, কিসে আমার একটু আরাম হবে সেদিকে খেয়াল করা এসবি তোমাকে করেছে পুরোপুরি আলাদা একজন স্বামী। তোমার বউ নিশ্চিত লাকিয়েসট স্ত্রী ইন দি ওয়ার্ল্ড । তোমাকে এই জনমে ছেড়ে দিলাম কিন্তু পরের যতগুলো জীবন আসবে আমি প্রতিবারই তোমাকে চাই। প্রমিজ করেছ। মনে থাকে যেন।

চুল শুকানোর জন্যে হেয়ার ড্রায়ার অন করে যখন ওর চুল ড্রাই করে দিচ্ছিলাম ও খেয়াল করল যে মাত্র ৫ মিনিটেই ওর চুল ড্রাই হোয়ে গেল তখন আমাকে বলল,” কিভাবে তুমি এত কিছু জান মেয়েদের সম্পর্কে ছোট চুল শুকাতে এত কম সময় লাগে আর সেটা আমার জন্যে ভালো ।“ শুনবে একটা সিক্রেট ?

200101-p1

তোমার অত্ত লম্বা লম্বা চুল পরছিল গত ক’দিন ধরে আর আমি ওগুলো ক্লিন করেছি বেশ ক’বার বিছানা থেকে তোমাকে না দেখিয়ে। সেজন্যে ই তোমার চুল কেটে দিলাম। “ “ ও রে শয়তান। এইটা হোল আসল কথা ?” ওর কথা বলার ভঙ্গি দেখে দু’জনেই হেসে ফেললাম।

আস্তে আস্তে সময় হোয়ে এল। ওর দু’ চোখ ভেঙে জলপ্রপাতের মতো অস্রু ঝরছে। আমি বিছানায় বসে ছিলাম। ও এসে আমার মাথাটা ওর বুকের মধ্যে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার চুলের গন্ধ নিতে লাগল । আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। আমাকে বলল,” তোমার এত গন্ধ আমি সাথে নিয়ে যাচ্ছি যাতে আমাদের মরনের পর আমি কোটি মানুষের মাঝ থেকে তোমাকে খুঁজে বের করতে পারি।“

“আমি জানিনা যে আমার চেয়ে বেশি লাকি মেয়ে দুনিয়াতে আর একটাও আছে কিনা। আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টুকু দেয়ার জন্যে । থ্যাংক ইউ যে আমাকে তুমি তোমাকে ভালো বাসতে দিয়েছ প্রান ভরে। গত ক’টা দিনে এত স্মৃতি সঞ্ছয় করেছি যে আমার আর কোনদিনই স্মৃতি বানাতে হবে না। থ্যাংক ইউ ফর দ্যাট। আমি আমৃত্যু এই ক’টা দিনকে পূজা করে যাব। থ্যাংক ইউ এগেইন যে আমাকে একটা বাচ্চা মেয়ে থেকে তুমি একজন ম্যাচুওর উয়োম্যানে পরিনত করেছ।“

আমি বললাম,” আমাকে থ্যাংকস বলার দরকার নেই সোনা বরং সবগুলো থ্যাংকস শুধু তোমারি জন্যে । থ্যাংক ইউ যে তুমিও আমাকে তোমাকে প্রানভরে ভালোবাসার সুযোগ দিয়েছ। থ্যাংক ইউ যে তুমি আমাকে বুঝতে শিখিয়েছ যে মানুষ একি সাথে একজনের বেশি মানুষকে কে ভালোবাসতে পারে। থ্যাংক ইউ যে তুমি আমাকে চিনিয়েছ যে ভালোবাসা কতো সুন্দর হতে পারে।

ভালো থাক সোনার মেয়ে।।ভালো থেক। কোনদিন যেন তোমার ওই মুখের হাসিটুকু মলিন না হয়। যদি কোনদিন সামনে পড়ে যাই তবে তুমিও আমাকে না দেখার ভান করে চলে যেও। একবার তোমাকে হারালাম কিন্তু নেক্সট সময় হারাবার মতো সাহশ আমার হবে না।

ও আমাদের বিছানায় চুমু দিল আর বলল,” থ্যাংক ইউ মাই ডিয়ার বেড, আমাকে ধারন করেছ গত ক’টা দিন।“ ওর দেখা দেখি আমিও বিছানায় চুমু দিলাম। ওর চোখ থেকে কান্না ঝরছে তো ঝরছেই। ও বাথরুমে গেল। আমিও পিছে পিছে গেলাম। ও যাকুজিকে, স্ট্যান্ডিং শাওয়ার, ড্রেসার, হেয়ার ড্রায়ারসহ সবগুলো জিনিস ছুঁয়ে ছুঁয়ে থ্যাংকস বলছে।
রুমে এসে ও সবকিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে শেষ বারের মতো । মনে হোল ওর পুরো অস্তিত্ব রেখে যাচ্ছে ওই রুমে। বেডের উপরে আলতো করে আদর করে দিল, ড্রেসিং টেবিলটাকে ছুঁয়ে দিল। ছোট্ট ফ্রিজটাকেও চুমু দিল…আমি বললাম,” চল সোনা, দেরি হোয়ে যাবে।“ ওর পা আর চলছিলনা, আমি শুনলাম ও বলছে আস্তে আস্তে,” রুম নাম্বার ১৭০৭, আমি সারাটা জীবনের জন্যে তোমার কাছে ঋনি হোয়ে রইলাম।“

alone-couple-girl-lake-love-sad-Favim.com-49210-1

কি ভীষণ গভীরতা ওর কথায়। আমি অবাক হোয়ে রইলাম। আমার বুকটা ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে কিন্তু জোর করে চোখের জল আটকে রাখলাম। কান্নার জন্যে তো সারাটা জীবন পড়ে আছে কিন্তু আমি যদি এখন দূর্বল হোয়ে পড়ি তবে ওর কি হবে।?
পেছন থেকে দরোজাটা টাান দিয়ে বন্ধ করে দিলাম। বেল বয় এসে আমাদের লাগেজগুলো ট্রলিতে করে নিয়ে গেল। ও বন্ধ দরোজার দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল। দু’ ফোঁটা অস্রু ওর হাতের উপড়ে পড়ল। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই অস্রু দরোজার উপরে মুছে দিয়ে এল। আমি ওকে লিফটের দিকে যাবার জন্যে টান দিলাম কিন্তু ও দাঁড়িয়ে রইল একেবারে প্রতিথ হোয়ে।

ওকে নাড়ানোর শক্তি আমার নেই। জোর করে নিয়ে এলাম লিফটের ভেতরে। ভেতরে ঢুকেই ও এক সাথে একটার পর একটা বাটন পুশ করতে লাগল। আমি বুঝতে পারছিলাম যে এতে হয়তো একটা এক্সট্রা মিনিট ও আমার সাথে বেশি থাকার সুযোগ পাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *