লাভ ইন ওমান -২০

তখনি মনে হোল যে ফ্রন্ট ডেস্কে আমাদের ফ্লাইটের কোন নতুন ইনফর্মেশন আছে কিনা সেটা জানার জন্যে কল করি। কল করতেই আমাকে জানাল যে ইরাকি এয়ারওয়েজকে পুরোপুরিভাবে আপাতত গ্রাউন্ড করে রাখা হোয়েছে আর দুই একটা যাই আছে সেগুলোকে হ্যাঙ্গারে নিয়ে রাখা হোয়েছে। আমেরিকা আর ন্যাটোর অর্ডারের কারনে ওটা করা হোয়েছে। আমাকে একটা নাম্বার দিয়ে কল করতে বলল যদি কোন ইনফর্মেশন চাই তবে হয়তো ওদের সাথে কথা বললে সেটা পাওয়া যাবে।

jumping-for-joy-85505

সাথে সাথেই কল করলাম। অনেকক্ষন ওয়েট করার পর একজন ফোন ধরে আমার এনকুয়ারীর জবাব দিচ্ছিল। আমাকে জানাল যে ওদের কাছে এখন কোন নতুন ইনফর্মেশন আসেনি যে কবে থেকে প্লেন চলা শুরু হতে পারে। আমি তখন তাকে বললাম যে অন্য কোন এয়ারলাইন্সে যদি ইরাকি এয়ারয়েজের টিকেট অনার করে তাহলে কি এখান থেকে ফ্লাই করা যাবে কিনা। উত্তরে আমাকে বলল যে এত বেশি লোক পুরো মিডল ইস্ট জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যে সব প্যাসেঞ্জারদের সবার জন্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের টিকিট জোগার করতে হচ্ছে তাই কম পক্ষে দুই দিন সময় লেগেই যাবে।

ও আমার পাশেই চোখ বন্ধ করে বসে ছিল আর সব শুনছিল। ও ইংরেজি বলতে না পারলেও কিছু কিছু বুঝতে শুরু করেছিল। আমি কথা শেষ করে ফোন রাখতেই বিছানার উপরে উঠে লাফিয়ে লাফিয়ে বলছিল,” ইয়েস।।আর ও দুই দিন।। টু মোর ডেস।। টু মোর ডেস।। আমাকে টান দিয়ে বিছানার উপরে শুয়িয়ে দিল।। আর আমাকে পাগলের মতো গালে, নাকে, ঠোঁটে চুমু খেতে লাগলো।

আমি খেয়াল করলাম যে কখন যেন আমার চোখে জল এসে গেছে। ওকে বুঝতে দিলাম না । তাছাড়া আমার দিকে তাকানোর সময় নেই তখন ওর হাতে।।নিজের খুশি নিয়ে এমন বিজি যে ও খুশিতে মনে হয় পাগল হোয়ে যাবে। আমার খুব ভালো লাগলো যে সকালে কান্নাকাটির পর ওর মুড এখন ভালো হোয়ে গেছে। আমি ওকে থামিয়ে দিলাম আর বললাম , হ্যাপি ?”

“সে আর বলতে। আই এম দি হ্যাপিয়েসট পারসন ইন দি ওয়ার্ল্ড। “ বলে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পরলো। ভাগ্য ভালো যে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ও এরকম একটা কিছু করবে। ও জাম্প করার সাথে সাথে আমি ওকে ধরে ফেলতে পারলাম। ছিপছিপে বাঙালি মেয়ে কতোই বা আর ওজন হবে? “আচ্ছা আমি যদি তোমাকে ধরে ফেলতে না পারতাম তাহ’লে তোমার হাত পা ভেঙে যেত তখন কেমন হোত শুনি ?” আমি বললাম।

1297938674784534

খুশি মুখে উত্তর দিল কি এক ভরশায়,’’ প্রথমতো আমি জানি যে তোমার কোলে নিশ্চিন্তে ঝাঁপ দেয়া যায় কারণ তুমি আমাকে বাঁচাবে । কোনদিনও আমার হাত ছেড়ে দেবেনা। দ্বিতীয়ত যদি আমার হাত পা ভেঙে যায়, যদি আমি কুতসিৎ হোয়ে ও যাই সারা দুনিয়াও এমনকি আমার তথাকথিত স্বামীও যদি আমাকে গ্রহন করতে না চায়, আমি জানি যে তুমি আমাকে ঠিকই গ্রহন করবে ।“ চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল।
“এতো বিশ্বাস সোনা ? কিন্তু আমি যে অত ভালোবাসার যোগ্য নই। আমি জানতাম যে এমন একটা কিছু হবে কিন্তু আমি তোমাকে আটকাইনি ।“

গলায় জোর এনে বলল,” তুমি আমাকে মানা করেছো, আমাকে বার বার ভাবার সময় দিয়েছ। আরে বোকা ছেলে, তুমি পড়নি যে আগুন দেখে পোকা জানে যে আগুনে তার পুড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে তবুও পোকা আগুনের দিকেই ছুটে যায়। আমি কি জানতাম না যে আমি বিবাহিতা, স্বামীর কাছে যাচ্ছি তাছাড়া তুমিও বিবাহিত । আমাকে তো মিথ্যে বলনি। তারপরেও আমি জেনে শুনে গুনে গুনে পা ফেলেছি কারণ আমি তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ দ্যাট ।“

তিন দিন আগের ওর সাথে আজকের ওর অনেক পার্থক্য । তিন দিন আগের সেই সবকিছুতে ভয় পাওয়া, চুপ চাপ থাকা, কথা কম বলা ওর সাথে আজকের এই ভালোবাসায় বিশ্বাসী, প্রান চঞ্চল ওর সাথে ডিফারেন্স সহজেই চোখে পড়ে । সত্যিই ভালোবাসা মানুষকে অনেক সাহসি বানায় ।

flirty-couple-hugging

রুম সার্ভিস আমাদের ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসে দরোজায় নক করল। দরজা খুলতেই একটা পুশ কার্টে করে কফি, চা, চিনি, ক্রিম, ক্রসান্ত, আঙুর, স্ক্রাম্বলড এগ, জেলি এসব নিয়ে এল। আমি ভালো একটা টিপস দিলে লোকটা খুশি হোয়ে চলে যায়। ও জিজ্ঞেসকরল,” লোকটাকে টাকা দিলে যে ।“ আমি বললাম,” আমেরিকাতে এই একটা জিনিস খুব ভালো যেটা ইউরোপিয়ানদের মধ্যে নেই ।

আমেরিকাতে যে কোন সার্ভিস-এর জন্যে সবাই কমপক্ষে ২০% টিপস যেটা আমাদের দেশে বা ইনডিয়াতে বকশিশ নামে পরিচিত।“ ও আমার কফি বানিয়ে দিল সাথে নিজের জন্যে চা বানাল। আমি বললাম,” নিউইয়র্ক খুব ঠাণ্ডা জায়গা, চাতে চলবেনা সেজন্যে এখন থেকেই কফির অভ্যেস করতে থাক। নইলে ঠাণ্ডায় জমে যাবে।‘ ‘সেটা যখন যাব তখন দেখা যাবে, বলে ওর চাতে চুমুক দিল।
ব্রেকফাস্টের পর আমি ওকে বললাম,” সোনা আজ কি যাবে বল। কাল যে ব্রশিবওরগুলো এনেছিলাম সেখান থেকে একটা জায়গা ঠিক করে চল সারাদিন কাটিয়ে আসি।

ও বলল,” সোনা, আমি জানি যে আমাদের সময় শেষ হোয়ে আসছে। আমি জানি যে দুই বা তিন দিন খুব বেশি হোলে এখানে আছি। তাই এখন থেকেই আমি আর কথাও যাবনা। আমি সময় নষ্ট করতে চাইনা। আমি শুধু তোমার সাথেই বাকি সময়টুকু কাটাতে চাই। তোমার সাথে গল্প করতে চাই, তোমার সাথে ভালোবাসা করতে চাই, আমি শুধু তোমাকেই চাই আর তোমার সাথেই সময় কাটাতে চাই। “ আমিও কিন্তু এটাই চিন্তা করছিলাম যে কি দরকার শুধু শুধু বাইরে যেয়ে ? কিন্তু বলিনি এই ভেবে যে ও যদি আমার ওয়াইফের মতো বিভিন্ন জায়গায় যেতে পছন্দ করে ।

Man-comforting-a-woman

আমি ওকে বিছানায় টেনে নিয়ে এলাম। জিজ্ঞেস করলাম,’ সোনা আমাকে বল যে তুমি কি হ্যান্ডেল করতে পারবে আমাকে ছাড়া ? প্লিজ মন খারাপ করনা। আমার জানাটা খুবই দরকার নইলে যে আমি মরে ও শান্তি পাবনা।“ ও আমার মুখে হাত চেপে ধরল। “ মরার কথা বলবেনা । আমি চাই তুমি বেঁচে থাক অনেক দিন। আমি আর কাঁদতে পারছিনা । টায়ার্ড হোয়ে পড়েছি। আমাকে আর কাঁদিয়োনা প্লিজ। আমি জানি আমার কাঁদার দিন শুরু হবে আমেরিকা গিয়ে। তোমাকে তো আর আমার সামনে পাবোনা । তখন আমি তোমার জন্যে প্রানভরে কাঁদব । তুমি তো আমার জন্যে রেখে যাবে শুধুই জীবনভর কান্না ।

আমার হাতের উপরে শুয়ে রইল। আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। আমার মনটা ভেঙে গেল । এক সহজ সরল বাঙালি মেয়েকে আমি মাত্র ক’দিনেই মেয়ে থেকে মহিলা বানিয়ে দিলাম। আমি ওর ইনোসেন্স কেড়ে নিলাম। নিজেকে খুব অপরাধি ভাবতে লাগলাম। আমি ওর মুখ আমার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললাম, “ কি ভাবছ।।?”কতকিছু। আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। আমার বিয়ে। তোমার সাথে দেখা হওয়া, তোমার দিকে পাগলের মতো ছুটে যাওয়া । সব, সবকিছু ।

“তুমি যদি আমার দিকে পাগলের মতো ছুটে এসেছ বলছ , ভেবনা যে আমি একেবারে চুপ করে বসে ছিলাম । আমিও তোমার দিকে পঙ্গপালের মতো দৌড়ে গিয়েছি। আমি বলবনা যে দোষ তোমার বা দোষ আমার। আমারতো মনে হয় আমাদের দু’জনেরই কোন পূন্যের কারণে আমরা এখানে এসে মিলেছি ।“ ওর মুখ থেকে মেঘ সরে গেল।
“আচ্ছা আমাকে কি তুমি মাফ করতে পারবে সোনা ?” জোরে চাপ দিয়ে বুকের ভেতরে নিয়ে বললাম।

“মাফের কথা বলছ কেন ? তুমিতো কোন দোষ করনি। আমিও তো তোমাকে ভালোবেসে দোষ করিনি। তুমিই তো বলেছিলে যে আমাদের নিয়তি আমাদের এই হোটেলের রুমে নিয়ে এসেছে। কে জানে এই যুদ্ধটা বোধ হয় শুধু একটা উছিলা মাত্র। আসলেই তোমার কথা ঠিক। আমাদের এই ভাবে এখানে আসা, ভালোবাসা এসব হয়তো লক্ষ কোটি বছর আগে থেকেই নিয়তি আমাদের জন্যে নির্ধারিত করে রেখেছিল।“ বিজ্ঞের মতো বলতে লাগলো । আমি যাকে ইম্মাচুওর বলে ভেবেছিলাম ও আসলে ইম্মাচুওর না জাস্ট ইনোসেনট । বুঝলাম ও আর কাঁদতে চাচ্ছেনা কারণ ও কেঁদে কেঁদে টায়ার্ড হোয়ে পড়েছে।

GTY_couple_sleeping

ওর মাথার নীচে আমার হাত । আমি ওকে কাছে টেনে আনলাম। ও ঘুরে আমার বুকের উপরে ভর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। “ কি দেখছ অমন কোরে?”
“দেখছি যে কিভাবে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ মাত্র ক’দিনে আর একজন মানুষকে সম্পূর্ণ গ্রাশ করে ফেলতে পারে।। কিভাবে ক’দিনে আগের অপরিচিত একজন লোক যাকে কখনো চোখে দেখিনি, যার কথা কোনদিন কানে শুনিনি আজ সেই আমার সবচেয়ে আপন । জীবনের এই দিকটা সম্পর্কে আমি এতটুকু জানতাম না। বুঝতাম না ।

আমার যখন বিয়ে হোল তখন আমার কোন রিঅ্যাকশন হয়নি। বাবা মা আমাকে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিয়ে দিল। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিলাম। আর দশজন মেয়ের মতো ই আমার জীবনটা হোত কিন্তু বিধাতা বোধ হয় উপড়ে বসে সবার অলক্ষ্যে হাসছিলেন । তোমার সাথে পরিচিত হোয়ে আমাকে আমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হোল।“

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ৪ দিন আগের সেই লাজুক মেয়েটি যেন জাদুবলে হোয়ে উঠেছে একজন বিজ্ঞ মানুষ। “জান আমাকে যদি কেউ লাস্ট উইকেও বলত যে আমি এভাবে এখানে এসে জড়িয়ে যাব তোমার সাথে, আমাকে যদি কেউ বলত যে আইনত বিয়ে হোয়ে যাবার পর আমি তোমার বুকে মাথা রেখে কাঁদবো যাকে কিনা লোকে পরকিয়া প্রেমের নামে বদনাম করতে চাইবে…।তাহলে আমি তাকে সোজা পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতাম।“ আস্তে আস্তে বলতে লাগলো ।

আমি বললাম,” ভালোবাসা, প্রেম আসলেই এই দুনিয়ার জিনিস না। স্বর্গ থেকে আসে আবার স্বর্গেই চলে যায় আর সেজন্যে ই তো কেউ কোনদিন ভালোবাসা নিয়ে বড়াই করতে পারেনা। কেউ বলতে পারেনা যে জীবনের কোন মোড়ে, কোন অলিতে গলিতে কার জন্যে কে ভালোবাসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোবাসাহীন সারাজীবনের চেয়ে ভালোবাসা নিয়ে ক’টা দিন বেঁচে থাকা অনেক অনেক বেশি জরুরী। “

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *