লাভ ইন ওমান -১৬

ড্রাইভার আমাদের ওমানের সুলতানের বাড়ী দেখাতে নিয়ে গেল। দারুণ সুন্দর একটা রাজপ্রাসাদ। আমরা ঠিক একেবারে প্রাসাদের সামনে যেতে পারিনি সিকিউরিটির কারনে কিন্তু ড্রাইভার সাহেব ওদের সাথে বিশেষভাবে বলে কয়ে আমাদের জন্যে ৫ মিনিট সময় নিয়ে এসেছে শুধু কিছু ফটো তোলার কথা বলে। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম ।

ও আমার ছবি তুলে দিল কিন্তু যখন ওকে ওর ছবি তোলার কথা বললাম তখন ও বলল যে ছবি তুললে হয়তো আমাদের দুজনের জীবনেই প্রবলেম হোতে পারে। আমি ওর ম্যাচুওরিটি আর দূরদৃষ্টি দেখে বেশ অবাক হলাম।

Sultan's Palace

আমিও ভাবলাম যে আমার জীবনেও ছবিগুলো প্রবলেম সৃষ্টি করতে পারে। আমি নিশ্চিত আমার স্ত্রীও আমাদের দু’জনের ছবি গুলোকে সহজভাবে নিতে পারবেনা।আমি তখন ওকে বললাম,” তাহলে আমদের কাছে কারোরই কোন স্মৃতি চিহ্ন থাকবেনা।? যদি অনেকদিন পর কোন এক নির্জন দুপুরে তোমার মন উদাশ হোয়ে যায় আমার কথা ভেবে বা আমার মন কাঁদে তোমাকে দেখার জন্যে তখন তো তা হোলে কেউ কাউকে দেখতেও পারবনা।“ ও কাঁদো কাঁদো মুখ করে বিজ্ঞের মতো বলল যেন ও ভালোবাসার উস্তাদ,” কে বলল দেখতে পাবে না।।তুমি তো তোমার হৃদয় খুলে একটু চেষ্টা করলেই আমাকে দেখতে পাবে আর আমি তো জানিই যে আমি তোমাকে ঠিকি দেখতে পাব বাকিটা জীবন চোখ বন্ধ করলেই।“

আমি ওকে আমার দিকে টেনে আনলাম। ওর হিপের উপরে আমার হাত রেখে বুকের মাঝে টেনে নেব ঠিক তখনি ও আমার কানে কানে বলল,” হোয়েছে, এত ভালোবাসা দেখাতে হবেনা। জানত এটা খুব কনজারভেটিভ মুসলিম দেশ। একটু এদিক ওদিক দেখলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে।“
আমি হাসতে হাসতে ওকে জিজ্ঞেস করলাম,” তুমি কোত্থেকে জান এসব?” ও বলল,” এটাত কমন সেন্স। আরব দেশের লোকেরা এখন খুব বর্বর আর অশিক্ষিত। আমি বেশ কতগুলো বই পরেছি। টি ভি নিউজে দেখেছি।“ আমি ওকে কমপ্লিমেনট দিয়ে বললাম,” স্মার্ট, ভেরি স্মার্ট।“

আমরা মাস্কাটের বিভিন্ন জায়গায় সারাদিন ঘুরে দেখলাম। ড্রাইভার সাহব আমাদের দেখার ব্যাপারে অনেক হেল্প করলেন। বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানি লোকে ভরা মাস্কাট শহর। আমাকে বলল যে অর্ধেকের বেশি লোকি বিদেশি। বাংলাদেশের চেয়ে ৩০ হাজার স্কয়ার মাইল বড় দেশ ওমান।
আমি লাঞ্চ কোথায় খেতে চায় বলে জানতে চাইলাম। “একটা কিছু হলেই চলবে।“ কিন্তু আমরা যখন আল আযাইবা এরিয়া দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন সে ম্যাকডোনালের উঁচু বড় হলুদ আর লাল রঙের এম লিখা সাইন দেখে ওখানে যেতে বলল ড্রাইভার সাহেবকে। আমি অবাক হোয়ে গেলাম যে এত দিন আগে ও ম্যাকডোনালের কথা জানত। আমি জানিনা যে এখন কতোগুলো ম্যাকডোনালড আছে কিন্তু তখন শুধু একটাই ছিল।

mCdONALD, oMAN

ম্যাকডোনালের ভেতরটা ছিল একেবারে আমেরিকার স্টোরের মতো । আমি আমার পরিচিত এনভারনমেনট দেখে বেশ খুশি হলাম। ও আমাকে বলল যে ওর মার্কেটিং ক্লাসের বইতে ম্যাকডোনালের সম্পর্কে পড়েছে। আমি ওকে আসল ম্যাকডোনালের সবচেয়ে বেশি যা সেল হয় সেই বিগ ম্যাক, কোক আর ফ্রেঞ্ছ ফ্র্যাইজ অর্ডার দিলাম। বরাবরের মতো এবারো ওর খাবারের বেশির ভাগ আমাকে দিয়ে দিল। তবে ও খুব এমজয় করে খেল। আমি ড্রাইভার সাহেবের জন্যে একি খাবার নিয়ে ট্যাক্সিতে ফিরে গেলাম। পাকিস্তানি ড্রাইভার সাহেব খুব খুশি হলেন আমার কেনা খাবার দেখে। আমাকে বেশ ক’বার শুকরিয়া জানালেন। আমি খেয়াল করলাম যে ও খুব খুশি হোল যে আমি মনে করে উনার জন্যে খাবার নিয়ে এসেছিলাম। আমি ড্রাইভার সাহেবকে বললাম যে কোন ড্রাগ স্টোরের সামনে থামানোর জন্যে ।

ও আমাকে জিজ্ঞেস করল যে ওষুধের দোকানে কি কিনব। আমি বললাম যে আমার মাথা ব্যাথা ধরেছে। ও খুব অবাক হোয়ে গেল আর বলল,” কই আমাকে তো কিছু বলনি।।তাহলে আমি মাথা টিপে দিতাম।‘ আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটা রহস্যপূর্ণ হাসি দিলাম আর বললাম যে ও বুঝতে পারবেনা। হোটেলে ফিরে ওকে সব বলব।

ট্যাক্সি থামার পর আমি একাই যেতে চাইলাম ড্রাগ স্টোরের ভেতরে কিন্তু ও নাছোরবান্দার মতো আমার সাথে আঠা হোয়ে লেগে রইলো। বললাম,” আহ তুমি থাক না এখানেই বসে।“ ড্রাইভার সাহেবকে বললাম যে উনি যেন উনার খাবার খেয়ে ফেলেন এরি মধ্যে। আমার সাথে জোর করেই সে এই বলে ট্যাক্সি থেকে নামল যে ও কোনদিন ওষুধের দোকান দেখেনি মাস্কাটে।

আমি ওকে বগলদাবা করে ওষুধের দোকানে ঢুকলাম। ভেতরে এসেই আমাকে বলল,” তুমি কি ক্রেজি? আমাকে যদি ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে ভেগে যেত?” আমি হেসে বললাম,” ও আসলে এই কাহিনি? তোমাকে যদি ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে ভেগে যেত তবে তোমাকে কো ন আরাবিয়ান শেখের ৪ নাম্বার বিবি বানাত।“ ও আমাকে একটা চিমটি কাটল।

তখন আমি বললাম,” আমি পুরোটা পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজতাম তোমাকে খুঁজে বের করে আনার জন্যে । পৃথিবীর যতগুলো পাহাড়, পর্বত আছে আমি সবগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতাম তোমাকে খুঁজে বের করার জন্যে ।“ আমার কথা শুনে ও হাসিতে ভেঙে পরল। আর বলল,” আহারে আমার বীর পুরুষ। একটু বুদ্ধিও নাই আর বলে কিনা…

Nil Poddo

শোন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন,” ভালোবাসার জন্যে আমি হাতের মুঠোয় প্রান নিয়েছি,
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়, বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টা নীল পদ্ম…।“ বুঝলে আমি সুনীল না হোতে পারি, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি প্রেমিক আমি। সেটার কিছু উদাহরণ তো দিয়েছি এরি মধ্যে কি বল ?”

লজ্জায় লাল হোয়ে গেল আর বলল,” তুমি কোথা থেকে এতসব কথা পাও ? হায়রে আমার জামাই জানি কেমন হয়। ওর যদি ইন্টেলেকচুয়াল ম্যাচুওরিটি না থাকে তাহলে যে আমি কিভাবে সংসার করব তা জানিনা। তোমার এই যে এতসব স্মার্টনেস এগুলো যে কোন মেয়েকে চুম্বকের মতো টানবে। সেজন্যেই তো মরেছি আমি তোমার উপড়।“

“তুমি আমাকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছ তাই তোমার কাছে আমার সবকিছু ভালো লাগে“ আমি ওর কপালের উপর থেকে চুল সরিয়ে দিতে দিতে বললাম। “তুমি কিসসু জাননা মেয়েদের মনের সোনা,” বলে আমার হাত ধরল আবার। মানুষের অবচেতন মনে কিছু কিছু জিনিস কাজ করে যেমন এখানে করছিল। ও জানতো খুব ভালো করেই যে আমাদের এই সময়টুকু দ্রুত শেষ হোয়ে যাবে। আমার উপরে ওর কোন লিগ্যাল অধিকার নেই এমনকি ভালোবাসার অধিকারও নেই।

সেজন্যে ই এই ক’দিনের ভালোবাসাটা ওর কাছে আমাকে করে তুলেছে এক অসীম ক্ষমতার একজন যে কিনা ওকে ওর মনের জমিনের এতদিনের পরিচিত নরোম জায়গা থেকে ওর মূলসহ উপরে ফেলেছে। তাছাড়া ওর পলিমাটি পরা মনের নরম জমিতে আমিই প্রথম পদচিহ্ন ফেলেছি আর সেই নরম পলিমাটি এ ক’দিনেই হোয়ে গেছে শক্ত পাথর। যেখানে চিহ্ন দেখা যাচ্ছে কিন্তু সে চিহ্ন হোয়ে গেছে ফসিলের মতো যা কোনদিন মোছা যাবে না।

pHARMACY

পুরো আমেরিকান স্টাইল-এ বিরাট স্টোরের ভেতরে একেবারে শেষের দিকে হোল ড্রাগ স্টোর। আমি ওকে বললাম ঘুরে ফিরে দেখার জন্যে । ঢুকেই দেখলাম যে বেশ ক’জন বাংলাদেশী কর্মচারী ওই দোকানের ভেতরে কাজ করছে। আমি একজন দেশী ভাইকে বললাম যে ও যা চায় তা যেন ওকে দেয় আমি ওই ফাঁকে ওষুধের ওখানে যেয়ে আমি একটা নিরোধ এর প্যাকেট কিনলাম। কারণ আমি খুবই নিশ্চিত ছিলাম যে যেভাবে সম্পর্ক এগুচ্ছে তাতে ওটা হবেই আর সেটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র । আর তখন যেন আমি রেডি থাকি।

ও যত দেখছে ততই মুগ্ধ হোচ্ছে যে কতোবড় স্টোর । থরে থরে সাজানো হাজার জিনিস দেখে ওরতো মাথা খারাপ হবার অবস্থা। ও ওর এক্সাইটমেন্ট শেয়ার করার জন্যে ও আমাকে খুঁজে বের করে । “ এই দেখ, ও মা এত্ত জিনিস আমিতো জীবনেও দেখিনি।“ আমি ওর ছেলেমানুষি দেখে হেসে ফেললাম। কতো করে বললাম কিছু কিনতে কিন্তু ও কোনকিছুই কিনলনা। শুধু মাত্র দেখেই যে মানুষ এত খুশি হতে পারে তা আমার জানা ছিলনা।।

খেয়াল করলাম ওর কোন জিনিসের দিকে বিন্দু মাত্র টান নেই। মনে হয় ওর কোন চাহিদা নেই। কি ইনোসেন্ট । মানুষের জীবনে কতো কিছুর চাহিদা থাকে কিন্তু ওর ওসবের দিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। কতো কসমেটিক, কতো পারফিউম যা প্রতিটা মেয়েরই পছন্দ কিন্তু ওসবের ধারে কাছে ওকে দেখলাম না।

আমি জানি যে ও কোনকিছুই নেবে না আমার কাছ থেকে কিন্তু আমি জানি যে আমি ওর জন্যে কিছু না কিছু কিনবই আর ওর বরের যেন কোন প্রশ্ন না হয় সে ব্যাবস্থাও আমাকেই করতে হবে। ও আমার সাথে আঠার মতো লেগে রইল। এটা কি, ও টা কি প্রশ্নর পর প্রশ্ন আর আমিও ওকে বলতে লাগলাম যে কোন জিনিসটা দিয়ে কি হয়। স্টোরে থেকে বের হোয়ে অপেক্ষারত ট্যাক্সিতে উঠলাম । ও কিছুই বুঝল না যে কেন আমি ড্রাগ স্টোরে গিয়েছিলাম।

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার দিকে হোটেলে ফিরে এলাম। সারা দিনে ঘুরে ফিরে খানিকটা টায়ার্ড ফিল করছিলাম। সেটা ওকে বলতেই ও বলল,” জান আমারওনা বেশ টায়ার্ড লাগছে” বলেই আমাকে একটা চিমটি কাটল। আমি বললাম,” এটা কি হোল? চিমটি কাটলে কেন ?” ও বিজ্ঞের মতো উত্তর দিল,” দুজনের একি জিনিস মিলে গেলে চিমটি কাটতে হয়। “ “তাহ’লেতো সারা দিন আর সারা রাত আমাদের দু’জন দু’জনকে চিমটি কেটেই সময় পার করতে হবে।“

“তা তোমার টায়ার্ড লাগছে কেন শুনি?” “ আর বলনা। হাই হীল পড়েইত পায়ে ব্যাথা করছে।“ মনে মনে বললাম যে নো প্রব্লেম সোনা, রুমে গিয়েই তোমার পায়ের ব্যাপারটা ঠিক করা যাবে। ‘শোনো, এখনি বরং ডিনারটা সেরে যাই, তাহলে আবার নীচে আসতে হবে না। তাহলে ভালোবাসার জন্যে বেশি সময় পাওয়া যাবে।“ ওর মুখটা লজ্জায় লাল হোয়ে গেল। মাথা ঝাঁকিয়ে রাজি হোয়ে গেল।
রেস্টুরেন্ট এ আসা মাত্রই আমাদের পরিচিত সার্ভার এসে আমাদের ওয়েলকাম জানাল। আমরা শ্রিম্প আর চিকেন সাথে ওমানি ব্রেড অর্ডার দিলাম। আমি পরম ভালো বাসায় ওকে মুখে তুলে খাইয়ে দিলাম। ও একই ভাবে আমাকেও মুখে তুলে খাইয়ে দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *