লাভ ইন ওমান পর্ব -১২

আমার হাত আবার শক্ত করে ধরে বলল,” যদি কেউ না আসে তাহলে তো আমাদের দম বন্ধ হোয়ে মরতে হবে। “ আমি হেসে ফেললাম। বললাম,” বোকা মেয়ে এই দেখ কতগুলো ছোট্ট ছোট্ট ছিদ্র । এখান দিয়ে বাতাস আসছে। হাত দাও ফিল করতে পারবে। কেউ না কেউ আসবেই । তাছাড়া আমি নিশ্চিত যে সিকিউরিটি ক্যামেরা বা সুইচ বোর্ড, কোথাও না কোথাও জানতে পারবে যে আমরা এখানে আটকা পড়েছি। তাছাড়া আমরা এখনো মাটিতেই আছি। দুই ফ্লোরের মাঝে আটকা পড়িনি ।“

stuck

প্রায় ১০ মিনিট হোয়েগেল কিন্তু আমি অবাক হোয়ে গেলাম যে কেউই আমাদের খুঁজতে বা দেখতে এল না । আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখি যে ওর নাকের ওপরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে সেই ঢাকা এয়ারপোর্টে যেমন দেখেছিলাম। । ঠিক যেমনি শীতের সকালে দূর্বা ঘাসের উপরে কুয়াশা জমে থেকে তেমনি করে জমে আছে সেই বিন্দু বিন্দু ঘাম । ভেতরের আলোতে চিক চিক করছে।

মনে হোচ্ছিল সময় স্থির হোয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে কি করা যেতে পারে। সবগুলো বাটন মনে হয় দু’জনে মিলে হাজারবার পুশ করলাম। ঠিক যেভাবে বন্ধ হোয়ে ছিল, তেমনি করে আবার দরজা ওপেন হোয়েগেল । আমি মনে করলাম যে কেউ হয়ত খুলে দিয়েছে। লিফট থেকে বের হোয়েগেলাম দুজনেই। বাইরে এসে দেখি যে কেউ ছিলনা। অবাক কাণ্ড ।

ও বেশ ভয় পেয়ে গেল। অন্য লিফট নিতে হবে বলাতে আমার হাত আবারো শক্ত করে ধরে রইল । আমি হেসে বললাম ,”তা’হলে তুমি এখানেই থাকো আমি অন্য একটা লিফট নিয়ে রুমে যাই। “ দেখি ওর চোখে জল টলমল করছে। “পাগল নাকি, এত ভয় পেলে চলবে কিভাবে ?’’ সিঁড়ি ভেঙে উঠি কিন্তু মনে রেখ ১৭ তলায় উঠতে তোমার পা ব্যথা করবে ।“ যাই হোক, কি মনে করে ও বলল,’ ওকে চলুন।“ আর একটা লিফট নিয়ে সোজা চলে এলাম ১৭ তলায়। রুমের দরোজা খুলতেই দেখি যে আমরা খাবার খেতে যাবার পর কেউ এসে আমাদের বিছানাটা সাজিয়ে গেছে ।

animal1

টাওয়েল দিয়ে একটা হাতি বানিয়ে বিছানার উপরে ক’টা চকোলেট রেখে গেছে। ও কখনো এসব দেখেনি বলে খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি একটু অপ্রস্তুত হোয়ে গেলাম কিন্তু ও পরক্ষনেই আমাকে ছেড়ে দিল। আমি ওকে বিছানায় শুয়ে রেস্ট নিতে বললাম কিন্তু ও বলল যে সে টিভি দেখবে। আমি পাশে থাকা ছোট একটা চেয়ারে বসে একটু রিলাক্স করার চেষ্টা করতে লাগলাম । কখন যে তন্দ্রা চলে এসেছে আর আমি এক মিনিটের জন্যে চোখ বন্ধ করেছিলাম মনে নেই কিন্তু ওর চিৎকারে সে তন্দ্রা ছুটে গেল। “ অহ মাই গড, দেখেন প্রায় সবগুলো চ্যানেলই ইন্ডিয়ান অর পাকিস্তানি। ইশ যা ভালো লাগছেনা।“

আমি ওর পাগলামি দেখে হেসে বললাম, “ আমার মনে হয় আমাকে তোমার থ্যাংকস বলা উচিত।“ হঠাৎ করে বলে বস্ল,” আপনি জানেন যে আমি মনে মনে আপনাকে কতোশতবার থ্যাংকস জানাই । আপনি না থাকলে আমি বোধ হয় মারাই যেতাম। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে আমি একা কি করতাম, কোন হোটেলে থাকতাম, কি খেতাম এসবের আমি কিছুই বুঝতাম না । আপনি কি আমাকে বুঝতে পারেন যে আমি এক দিনেই আপনার উপরে কেমন ডিপেনডেনট হোয়ে পড়েছি। “ ওর চোখ ভরে গেল অশ্রুতে । আমি কেমন যেন একটু অপ্রস্তুত হোয়ে গেলাম। আমি বিছানার ঊপড়ে ঊঠে এলাম , পরম যত্নে ওর চোখের জল মুছে দিলাম আর বললাম,” হোয়েছে আর বোলতে হবেনা ।“

Dil hain

বিছানায় বসে দু’জনেই টি ভি দেখতে লেগে গেলাম। এতদিন পর আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে যে ছবিটার নাম ছিল দিল হ্যায় কি মানতা নেহি। আমির খান আর পূজা ভাট-এর মুভি দিল হ্যায় কি মানতা নেহি। আর মনে হোচ্ছিল যে মুভিটা আমাদের জন্যেই বানিয়েছিল যেখানে আমির খানও একি রকমভাবে একটা অচেনা মেয়ের সাথে জার্নি করে আর সেখানে যে সব ঘটনা ঘটেছিল সেগুলো দেখিয়েছিল । আমি মুভিটা নিউইয়র্কে দেখেছিলাম আর ও দেখেছিল বাংলাদেশে । আমি বললাম,’”একটু ঘুমিয়ে নাও। সেই ভোর বেলায় উঠেছ। অনেক ধকল গিয়েছে। ভালো ফিল করবে।“ কিন্তু ও ঘুমাতে চাইলনা। আমি ব্যাপারটা ঠিকি বুঝতে পারলাম। একজন সম্পুরন অপরিচিত একজন লোকের সামনে একটা মেয়ে ঘুমাবে তাও আবার বাংলাদেশি মেয়ে এটা কেউ চিন্তাও করতে পারবেনা।

আমি ভাবছিলাম যে রাতে কি হবে ? রাতের বেলাতো ঘুমাতেই হবে। তখন কি হবে ? আমার খুবই চিন্তা হোল যে যদি ও আমার সামনে ঘুমাতে না চায় তবে কি করা উচিৎ হবে ? কাউকে তো বলতেউ পারবোনা। ঠিক আছে যা হবার হবে তবে আমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে যাতে আমার দিক থেকে কোনরকম ভুল না হয়। মেয়েটার পুরোটা পরিবার আমাকে বিশ্বাস করেছে সেখানে আমার দিক থেকে যেন কোনমতেই এতোটুকু বিশ্বাস ভঙ্গের কারণ না ঘটে।

আমি অল মোস্ট ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাদের নিতে ট্যাক্সি ড্রাইভার আসবে । ৬.৪০ মিনিটে মনে হওয়া মাত্রই আমি লাফ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠলাম আর ওকেও দ্রুত রেডি হোতে বললাম। ও এতো গরমে বাইরে যেতে চাইল না। আমি বল্লাম,’তা হবে না ম্যাডাম। আপনাকে উঠতেই হবে। জীবনে কোনদিন আর আসা হবে কিনা তাতো জানিনা সেজন্যে আমি যাব ঘুরতে । তুমি একা থাকতে পার কিন্তু কেউ যদি তোমাকে ধরে নিয়ে যায় “। এক লাফে উঠে পড়ল। আর আমি হা হা হা করে হেসে উঠলাম।

নীচে এসে দেখি ড্রাইভার আমাদের জন্যে ওয়েট করছে। ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন বয়স্ক লোক । আমাদের দেখে খুব সম্মান করে দরজা খুলে দিলেন। আমরা বসা না পর্যন্ত উনি উনার সিট এ বসলেন না। আমাদের বললেন যে কোন চিন্তা যেন না করি কারণ মাস্কেটের অলি গলি তার মুখস্থ। আমি শহরটা দেখাতে বললাম আর বললাম যে যদি আমাদের ক’দিন এখানে থাকা পরে তবে উনার সাথেই যাবো। সেজন্যে রুম নাম্বার দিয়ে বলে দিলাম যে প্রতি সকালে যেন প্রথমেই আমাদের খোঁজ নেন যদি থাকি তবে উনার সাথেই বের হবো হোটেল থেকে। কথায় কথায় উনি বলতে লাগলেন উনার কথা…

আজ থেকে ৪০ বছর আগে ভাগ্যের সন্ধানে ওমানে এসেছিলেন। সেই থেকে এখানেই আছেন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে তার পুরো পরিবার এখনো পাকিস্তানেই থাকে। এখান থেকে পাঠানো টাকায় তার ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করেছেন। তাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। খুব স্বাধীনচেতা লোক উনি, ছেলে, মেয়দের হাজার আপত্তি সত্ত্বেও তিনি ফিরে আসেন এখানে। বললেন যে ছেলেদের কালো মুখ উনি দেখতে চান না । শরীর আর স্বাস্থ্য এখনো ঠিক আছে তাহলে কাজ করতে দোষ কোথায় ?

ড্রাইভার সাহেবকে আমাদের বেশ ভালো লেগে গেল। উনি ভেবেছেন যে আমরা সবে মাত্র বিয়ে করেছি। আর আমি উনাকে সত্যি কথাটাও বলতে পারিনি । তাছাড়া ও যেভাবে আমার হাত ধরে থাকে সেভাবে কেউই আমাদের ম্যারিড না ভেবে অন্য কিছু ভাবতে পারবেনা । ড্রাইভার আমাদের ডাউন টাউন এরিয়াতে নিয়ে যেতে চাইলেন । বললেন যে ওখানে মুত্রাহ সোক নামে একটা পুরনো মার্কেট আছে যেটা ওমানের সবচেয়ে পুরনো মার্কেট। ওই মার্কেটে শত শত ছোট দোকান আছে যেখানে সিল্ভার ড্যাগার, বেদুইনদের বানানো জুয়েলরী, আগর বাতি, বিভিন্ন মশলা, মধু,পারফিউম, কার্পেট, কাপড়সহ হাজারো জিনিষ পাওয়া যায়।

ট্যাক্সি হাইওয়ে ধরে ছুটে চলল। চার লেনের প্রসস্থ্য রাস্তা। পাশে প্রচুর জায়গা খালি পরে আছে। রাস্তাগুলো পরিস্কার ঝকঝকে, কোন ভাঙাচুরা নেই । নিউ ইয়র্কের মতো ট্র্যাফিক জাম নেই। আসে পাশ দিয়ে সোঁ করে দামি জার্মান গাড়ী যেমন BMW, Mercedes, Audi চলে যাচ্ছে হেভী স্পীডে। আমার মনে হোচ্ছিলযে আমরা আই-৯৫ দিয়ে যাচ্ছি।

আমরা সেই বিখ্যাত মুত্ত্রাহ সোক ২০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। বিশাল এরিয়া জুড়ে এই মার্কেট আর হাজার হাজার লোকের সমাগম সেখানে। যাদের বেশিরভাগই বিদেশি। আমার ভয়ই হোচ্ছিলযে আমরা বোধ হয় হারিয়েই যাবো। ড্রাইভার সাহেব বুঝতে পেরেছিলেন যে এত বড় জায়গায় আমরা নিশ্চিত কিছুই কেনা কাটা করতে পারবনা। উনি বললেন যে উনি ট্যাক্সি পার্ক করে আসছেন। উনার এই বাবহারে আমি খুব খুশি হলাম। উনি আমাদের বিভিন্ন দোকানে শরট-কাট জায়গা দিয়ে আমাদের নিয়ে চললেন। খুবি গরম ছিল। বেশিরভাগ দোকানই খোলা দোকান। অল্প কিছু দামি দোকানে এয়ার কন্ডিশন ছিল। গরমে সেদ্ধ হোয়ে গেলাম।

Mutrah

আমি ওকে একটা ছোট গিফট দিতে চাইলাম কিন্তু ও আমাকে মানা করল কিছু কিনতে কারণ ও চায়না যে ওর বর কোন কিছু নিয়ে ওকে প্রশ্ন করুক। ওর দূরদৃষ্টি দেখে অবাক হোলাম । এজন্যে ই বলে যে মেয়েরা হোল থিঙ্কার আর ছেলেরা হোল ডুয়ার । ছেলেরা কখনই চিন্তা করে না যে কোন জিনিস নিয়ে কি রকমের প্রবলেম হোতে পারে। কিন্তু আমি কি আর অত সহযে ওকে ছেড়ে দেব। ঠিকি আমি ওকে কিছু একটা গিফট করবো যাতে সে আমাকে কোনদিনই ভুলতে না পারে। আমাকে কিছু না দিতে দিলেও ও কিন্তু ঠিকি আমাকে দামি একটা কলম কিনে দিল আর আমাকে বাধ্য করল সেটা নিতে ।

muttra Soq, Oman

এত গরমে আমি রীতিমতো টায়ার্ড হোয়ে গেলাম। ঘণ্টা খানেক পর আমি ড্রাইভার সাহেবকে বললাম যে আমাদের হোটেলে পৌঁছে দিতে। ওর অবস্থাও কাহিল। ট্যাক্সিতে উঠে এয়ার কন্ডিশনের ঠাণ্ডা বাতাসে যেন দুজনেরই প্রান ফিরে পেলাম। একটু ঠাণ্ডা হবার পর ড্রাইভার সাহেব বললেন যে আল মিরানি স্ট্রিট দিয়ে গেলে আমাদের ভালো লাগবে । আমি হ্যাঁ বলাতে ঘুরিয়ে তিনি আল মিরানিতে উঠে এলেন। আমার মনে হোল যে রাস্তাটা অনেকটা আমাদের বেল্ট পার্ক ওয়ের মতো । গালফ অফ ওমানের পাশ দিয়ে চলে গেছে। দারুণ দেখতে লাগলো। রাত ৯.০০ এর দিকে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিলেন।

রুমে ফিরে এসে আমি ওকে বললাম, “আমি গোসল করে নিচ্ছি খুব তাড়াতাড়ি । আমি আসলেই তুমিও গোসল করে নাও। গরমে আমি নিশ্চিত শরীর ঘেমে লবন বের হোয়েছে । “ ও বলল,” ঠিক আছে।“
আমি গোসল সেরে আসতেই ও বাথরুমে চলে গেল। আমি জানি যে কমপক্ষে ১০ মিনিট তো লাগবেই। এই ফাঁকে আমি একটা টিশার্ট পড়ে নিলাম। ডিওডোরানট আর অ্যান্টি পারস্পিরান্ত দিলাম হাতের নিচে। আমার ফেভারিট কোলন ক্রিড স্প্রে করে ফ্রেশ হোয়ে বসে রইলাম টিভি অন করে। আসলে সারাদিনই আমি যুদ্ধের খবর দেখব বলে প্ল্যান করেছিলাম কিন্তু সময় হোয়েউঠেনি। তখন আমি খেয়াল করলাম যে ইরাক, কুয়েতসহ পুরো মিডল ইস্টে এয়ারপ্লেন বন্ধ সেই মুহূর্তে। আমার কেন যেন মনে হোল যে আমাদের এখানে বেশ ক’দিন থাকতে হবে। আমি চিন্তা করলাম যে আপাতত ওকে কিছু বলবনা। নইলে সে না আবার কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। ও আসার আগেই আমি টিভি বন্ধ করে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *