লাভ ইন ওমান পর্ব -১১

জীবনটা অনেকসময় এমনভাবে আমাদের সামনে চলতে থাকে মনে হয় যে আমরা ইচ্ছে করলেও এই ভাবে ঘটনাটা ঘটাতে পারতাম না । ভালোবাসার এই ফাঁদ পাতা ভুবনে, কখন কিভাবে যে কে কোথায় ধরা পরে যায় তা কেই বা জানে ? আচ্ছা, যদি এমন হত যে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ জানতে পারতাম আগে থেকেই । আগে থেকেই দরকার নেই যদি আমরা ১০ মিনিট আগে জানতে পারতাম যে আমাদের জীবনে কই হতে যাাচ্ছে তাহলে কি ভবিষ্যৎ, ভাগ্য, নিয়তি এ ধরনের কোন শব্দ থাকতো ? আমারতো মনে হয় মানুষের আগে থেকে জানার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই । এভাবেই আমরা ভাল আছি। জীবনের এই সারপ্রারাইজগুল আছে বলেইতো জীবনটা এতো মধুর ।

Couple 33

মনে হয় যে এভাবে অপ্রত্যাশিত কিছু সময় আসে প্রতিটা মানুষের জীবনে কিন্তু তাকে চেনার মতো মন থাকতে হবে । একটা মুহূর্ত জীবনকে টোটালি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিতে পারে। জীবনকে নিতে হয় একটা গিফট হিসেবে । বাঁচতে হয় শুধু একটা মুহূর্তের জন্যে । অনেক আগে পড়েছিলাম এ গিফট অফ দি মেজাই তাতে সেই জ্ঞানী বলেছিলেন যে তুমি এখন যে কাজ করছ সেটাই এই মুহূর্তে তোমার জন্যে সবচেয়ে জরুরি কাজ। তুমি এখন যার সাথে আছো সেই তোমার জীবনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট মানুষ । সে হিসাবে ওই ছিল ওই মুহূর্তে আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

মানুষ তার ভাগ্যের সাথে লড়তে পারে । চেষ্টা করে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারে কিন্তু মানুষ তার নিয়তির সাথে লড়ার ক্ষমতা পায় নি। তাইতো আজও আমরা আমাদের নিয়তির হাতের পুতুল। নইলে একবার যে আমি কি একবারও ভেবেছিলাম যে ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক যাবার পথে আমরা এক বিদেশ বিভূঁই-এ অমন করে আটকা পড়ে যাবো ? ক’ঘণ্টা আগেও যাকে কোনদিন দেখিনি, যার কথা কোনদিন শুনিনি তারই সাথে দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এভাবে একই রুমে একি বিছানায় বসে কথা বলবো ? নিয়তি আমাদের জীবনে কিভাবে আমাদের নিয়ে খেলে তা কেউ জানেনা।

সম্পূর্ণ এক নতুন জায়গায় একজন সম্পূর্ণ মানুষের সাথে কিভাবে সময় কাটাবেন। এর জন্যে নেই কোথাও কোন বই বা ম্যানুয়েল যা পড়ে আমরা শিখতে পারি যে How to spend time with a total stranger who is happened to be an opposite sex in a hotel room thousands miles away from home ? কথায় আছে যে বিদেশে এসে স্বদেশী একটা কুকুরেরও মূল্য বিদেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের বেলায় ঠিক তাই হোল। সেই একাকি পরিবেশে আমাদের চেনা জানা কেউ ছিলনা।

শুধু চিনতাম একে অপরকে । শুধু ছিলাম আমরা একে অপরের জন্যে । কেমন একটা অনিশ্চিত অবস্থায় ছিলাম আমরা দু’জন। কেমন করে সময় কাটানো যায় যখন আমরা জানতামই না যে ওই অনিশ্চিত সময় কখন শেষ হবে । স্মৃতিময় ঘটনাগুলো বার বার এসে ভিড় জমায় মনের কোণে। কিভাবে সেই কঠিন কিন্তু খুবই নাজুক মুহূর্তগুলো পার করেছি, কিভাবে বলা যায়, কিভাবে বোঝান যায় যে কি চলছিল আমাদের সেই ক’দিনের অসামান্য কিছু সময়ে একে অন্যের সাথে শেয়ার করা সময়গুলোতে ?

beach-couple

ক্ষিধে লেগেছিল বেশ। সেই কোন ভোরে খেয়েছিলাম। “ চল, নীচে যেয়ে খেয়ে আসি,” বলাতেই এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে গেল । “ চলুন। আমার না ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে কিন্তু বলতে লজ্জা লাগছিল “ হাই হিল স্যান্ডেলটা পড়তে পড়তে বলল। আমি বললাম,” পেটে ক্ষিধে মুখে লাজ থাকলেতো তোমার কষ্ট লাগবেই। এর পরের সময় প্লিজ আগে থেকেই বলবে যদি ক্ষিধে লাগে। চল।“

ইরাকি এয়ারওয়েজের ইস্যু করা ভাওচারটা নিয়ে দরজা টান দিয়ে বন্ধ করে লিফটের দিকে আগালাম। বাটন পুশ করতেই চলে এল । ভেতরে ঢুকে লবি লিখা বাটনটা পুশ করতেই দরোজা বন্ধ হোয়ে গেল। মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। Hold লিখা বাটনটা পুশ করতেই লিফটটা থেমে গেল। আমি বললাম,” এখন কি হবে? কিভাবে বাইরে যাব ? ও মাই গড এখানেই কি আটকা পড়ে থাকতে হবে ?” ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম। মুখ শুকিয়ে গেছে। ভয়ে শেষ।

আমার বা হাতটা শক্ত করে ধরল। “ তা’হলে কি হবে ?” দেখি কান্না কান্না ভাব মুখে। যত ভয় দেখাই ও ততো আমাকে শক্ত কর আঁকড়ে ধরে । মিনিট খানেক পর আবার বাটনটা পুশ করতেই আবার চলা শুরু করলো । এবার ও বুঝতে পারলো যে ওটা আমারই কাজ ছিল। এখন আমাকে ও কিল দিতে থাকে ওকে বোকা বানানোর জন্যে । আমি ওর কাণ্ড দেখে হাসতে থাকি।

লবিতে এসে রেস্টুরেন্ট লিখা নিয়ন সাইনের দিকে আগালাম। ও তখন আমার হাত ধরে ছিল । রেস্টুরেন্টটার ভেতরে খুবই সুন্দর। ও বলল,” দেখেন কতো সুন্দর ভেতরতা তাইনা ?’’ ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “ তবে তোমার চেয়ে বেশি না।“ “ তাই নাকি?” আমি বললাম,” হ্যাঁ তাই তো। নিজেকে কখনো আয়নায় দেখেছো ?” “ হোয়েছে, এতো পাম্প দিতে হবেন,” বলতে বলতেই আমরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে গেলাম। আমাদের জানালার পাশের একটা বুথের ভেতরে জায়গা করে দিল। সাথেই ছিল একটা বড় জানালা।

ভারী পর্দাটাকে একটু সরালেই জানালা দিয়ে প্রচণ্ড রোদ এসে ওর হাতের উপরে পরল। ক্রিস্টাল ক্লিয়ার সানি ডে। মাঝে মাঝে ক’টা গাড়ী চলছিল হাইওয়ে দিয়ে। আমি ভাবছিলাম যে জানুয়ারী মাসের তৃতীয় সপ্তাহেই এত গরম বাইরে তা’হলে জুলাই বা অগাস্ট মাসের গরম কেমন। সাথে আমি এটাও ভাবছিলাম যে আমিতো ফ্লোরিডা আর লাস ভেগাসের কঠিন গরম দেখেছি । তার চেয়ে আর বেশি কি হবে ?

আমরা বসতেই ওয়েটার চলে এল। বেশ স্মার্ট একজন ২৫/২৭ বছর বয়সী একজন অ্যারাবিয়ান ছেলে । সাথে নিয়ে এল গরম ব্রেড স্টিক আর বাটার । আইস কিউব সহ ঠাণ্ডা জল ও নিয়ে এল । আমাদের মেন্যু ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। মেন্যুর খাবারগুলো প্রথমে আরবীতে লিখা আর নিচে ইংরেজীতে অনুবাদ করে লিখা বিদেশীদের জন্যে । আমি একটা গরম ব্রেডস্টিক নিয়ে তাতে একটু বাটার লাগিয়ে ওকে দিলাম। আর ও আমাকে একটা ব্রেড স্টিক বাটার লাগিয়ে দিল । মেন্যুতে অনেক রকম খাবার আছে। অ্যারাবিয়ানরা সাঙ্ঘাতিক রকমের মাংসাশী প্রাণী ( হা হা হা)। কিন্তু মাস্কাট গালফ অফ ওমানের সাথেই হওয়াতে প্রচুর পরিমানে মাছ পাওয়া যায় । সেজন্যে আমাদের খাবারের অর্ডার কোন অসুবিধাই হোলনা ।

আমি মাটন মানে খাশির মাংশ খেতে খুবি পছন্দ করি। কিন্তু যখন ওকে জিজ্ঞেস করলাম তখন ও আমাকে একটা ইয়াক লুক দিল আর আমি তাতেই বুঝে নিলাম যে সে মাটন লাইক করেনা । বলল যে মাটনে খুব বাজে গন্ধ আছে সেজন্যে সে লাইক করেনা । তবে আমি খেতে পারি ওতে কোন প্রবলেম নেই । আমি বললাম,” তোমার সম্মানে যতক্ষণ তোমার সাথে আছি ততক্ষণ মাটন খাব না।“

Omani Food-1

মনে হোল ও বেশ খুশি হোল। ওমানি খাবার বেশ সিম্পল কিন্তু বেশ মজার। আমি নিলাম মাকবউস নামে একটা খাবার যা অনেকটা আমাদের দেশের বিরিয়ানির মতো । ম্যারিনেট করা বীফ, চিকেন বা মাটন লাল বা হলুদ কালারের সাফরন ( বাংলায় আমরা যাকে বলি জাফরান) দিয়ে একসাথে মিলিয়ে চালের সাথে রান্না করা খাবার। বেশ মজার ছিল খাবারটা । এর পর খেলাম অ্যারাবিয়ান খেজুর সাথে “খাওয়া “ মানে ওমানি কফি। ফ্রেসলি রোস্টেড গুঁড়ো কফির সাথে এলাচী আর পিস্তাসিও দিয়ে ব্রু করা ।

আর ও নিল চারব্রয়েলড উড ফায়ারড শ্রিম্প কাবাব, খুব কম রাইস। আর লাচ্ছির মতো ইয়োগারট ড্রিংক যার সাথে এলাচী্‌, আর পিস্তাসিও মেশানো ছিল। প্রবলেম হোল যখন কাঁটা চামচ আর নাইফ দিয়ে খাবার খেতে হোল । ও কোনমতেই খেতে পারছিলনা । আমি ওকে বললাম,” শোন, হাত দিয়েই খাও। আর রাইসটা খাও চামচ দিয়ে ,” মনে হোল যে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ।

Grilled Shrimp and Pineapple

বলল যে ওর কাছে দারুণ লেগেছে লাঞ্চটা । আমাকে থ্যাংকস জানাল । ওর ভালো লেগেছে দেখে আমারো ভালো লাগলো । আর আমিতো ভেবেছিলাম যে বাঙ্গালিদের মতো ভাত আর মাছের তরকারি না পাওয়াতে কোনকিছুই খেতে পারবেনা। ভালো লাগলো এটা দেখে যে ও ঠিকমতোই খেতে পারলো । তবে এটাও ঠিক যে পেটে ক্ষুধা থাকলে সবকিছুই খেতে পারা যায় ।
Khaowa,Omani Coffee

ওয়েটার আমাদের বিল নিয়ে এলে আমি ভাওচারটা দিলাম। সীল মেরে নিয়ে এল সে। আমি কিছু টিপস দিলাম। ওকে বললাম,”টিপসের একটা ব্যাপার আছে। সাধারনত ইউরোপিয়ানরা কখনো টিপস দেয় না কারণ ইউরোপে রেস্টুরেন্ট বিল, ট্যাক্সি বিল এসবের সাথে সার্ভিস চার্জ বলে অটোমেটিক অ্যাডেড থাকে কিন্তু আমেরিকাতে টিপস করা থাকেনা কিন্তু ১০০% সাদা আমেরিকান ২০% টিপস দেয়। আফ্রিকান আমেরিকানরা তেমন দেয়না। তবে ইন্ডিয়ানরা হোল সবচেয়ে চিপ। ওরা টিপস দেয়না পারলে দামাদামি করে আসল দামটাই কমাতে চেষ্টা করে ।“শুনে হেসে ফেলল। “ তাহলে ইন্ডিয়ান রা কি করে ?” কিছুই করেনা । শুধু দাম দিয়ে চলে যায়।“

ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে সাইট সিয়িং-এর ব্যাপারে ইনফরমেশন নেয়ার জন্যে দু’জনেই গেলাম। রিসিপশনিসট মেয়েটা দেখতে বেশ সুন্দর, ফরশা আর মাথায় খুব স্মার্টভাবে হিযাব বাধা। আমাদের দেখে বেশ খুশি হোল। ও আমার হাত শক্ত করে ধরেছিল। সেটা দেখে মেয়েটা বলল,” নিউলি ম্যারিড ?” আমি মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকালাম । ওর দিকে তাকিয়ে দেখে মনে হোল যে ও ঠিকই বুঝেছে যে কি বলল মেয়েটা কিন্তু চুপ করে রইল হাসি মাখা মুখ নিয়ে । আমি ট্যাক্সি ডাকার ব্যাপারে কথা বলতেই মেয়েটা টেলিফোন করে মাঝ বয়সী একজন লোক ডেকে আনল ।

Capture

ওই মেয়েটা তাকে আরবি ভাষায় কিছু বলাতে সে ওকে বলে চ়়লে গেল। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে মেয়েটাকে আরবিতে কিছু বলায় মেয়েটি বলল আমাদেরকে ওই লোকটার সাথে যেতে। হোটেলের বাইরে আসা মাত্রই মনে হোল যে একটা গরম ওভেনের ভেতরে চলে এসেছি। প্রচণ্ড গরম । একজন বয়স্ক ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে কথা বলিয়ে দিল। ড্রাইভার অল্প ইংরেজি জানাতে ভালো ই হোল। আমি তাকে সন্ধ্যে সাতটার দিকে আসতে বললাম । কারণ তখন একটু গরম কম থাকবে যদিও ট্যাক্সির ভেতরে এয়ার কন্ডিশন থাকবে।

বললাম,” চল রুমে ফিরে যাই। সেই ভোরে উঠেছি। টায়ার্ড লাগছে।“ ও বলল,” ঠিকি বলেছেন। আমিও একটু টায়ার্ড ফিল করছি।“ লিফটের জন্যে ওয়েট করছিলাম বাটন টিপে । লিফট এলে ভেতরে ঢুকে পরলাম। দরোজা বন্ধ হোয়ে গেল। প্রবলেমটা হোল যে কোন বাটনই কাজ করছিলনা । একের পর এক বাটন টিপে যাচ্ছিলাম কিন্তু কোনকিছুতেই লিফট মুভ করছিলনা। এমনকি ইমারজেন্সি বাটনও কাজ করলনা। মনে হোচ্ছিলযে ও বোধ হয় ভয় পেয়ে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *