লাভ ইন ওমান পর্ব -১০

লিফট এসে থামল আর অটোটোম্যাটিক দরোজাটা খুলে গেল। কেউ নেই ভেতরে। আমি লবির নাম লিখা বাটনটা প্রেস করতেই ছুটে চলল নীচের দিকে। লিফটের ভেতরে ও মুড অফ করে এক কোণায় দাঁড়ালো। আমার খুব খারাপ লাগলো ওর মুড খারাপ থাকাতে। অটোটোম্যাটিক দরোজাটা খুলে গেল আবার । আমরা লবিতে ঢুকে দাঁড়ালাম চারিদিকে কোথায় কি আছে সেটা দেখার জন্যে । যাকে বলে স্ক্যান করে নেয়া । লবিতে আসার সময়েই আমি খেয়াল করলাম সে নিজের অজান্তেই আমার হাত ধরে ফেললো ।

Holding hand

বেশ অনেকগুলো দোকান ছিল বিভিন্ন জিনিসে র। সারা দুনিয়ার বাকি অন্যান্য হোটেলের মতো এখানেও সেই একি ডিজাইনার দোকান আর ছিল দু’টো কনভেনিয়েন্স স্টোর যেখানে প্রয়োজনীয় সব জিনিস পত্র কেনা যায়। আমি ওকে নিয়ে দোকানগুলো দেখছিলাম আর বললাম,” চল ভেতরে ঢুকি।“ “মোটেই না জনাব। যা কিনতে এসেছি তাই কিনে রুমে ফিরে যাই।“

বাংলাদেশ আর আমেরিকাতে কথা বলার জন্যে দু’টো আলাদা কার্ড কিনলাম। কিনে আর দেরি না করে সোজা রুমে ফিরে এলাম। বিছানার উপরে আরাম করে বসে আমি প্রথমে ওদের বাসায় কল করতে বললাম কিন্তু ও চাইল যে আমি আগে কথা বলে নেই তারপর ও কথা বলবে। আমি প্রথমে আমার ওয়াইফের সাথে কথা বললাম। ও বেচারিতো চিন্তা করতে করতেই শেষ। বার বার জানতে চাইল যে আমি ঠিক আছি কিনা। আমি পুরো ব্যাপারটা বিস্তারিত বললাম। চিন্তা করতে না করলাম কারণ আমি যুদ্ধের জায়গা থেকে প্রায় ৫০০ মাইল দূরে ছিলাম।
আমি ভালো একটা হোটেলে ইরাকি এয়ারওয়েজের তত্ত্বাবধায়নে ভালোই আছি। আমার মা বাবার সাথেও একটু কথা বলে তাদের চিন্তা করতে না করলাম।

ও ওর বাবা মাকে কল করলো। দেখলাম যে ও শব্দ না করে চোখের জল মুছছে। ও আমার সামনেই ওর মাকে বলল যে কাল যে লোকের সাথে পরিচয় হোয়ে ছিলো তারই পাশের রুমে ও থাকছে আর কোন অসুবিধা হোচ্ছেনা । হটাৎ করে আমাকে ফোনটা দিয়ে বলে যে ওর আম্মু নাকি কথা বলতে চায় আমার সাথে। আমি আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলাম যে আমি কি বলবো কিন্তু ততোক্ষণে ফোন আমার হাতে।

আমি সালাম দিয়ে বললাম,” কোন চিন্তা করবেন না খালাম্মা। আমি রেগুলার ওর খোঁজ নেব। “ উনি আমাকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানালেন। আমি আবার ওকে ফোন দিলে ও বলল যেন ওর বরকে বলে দেয় চিন্তা না করতে।“
কথা শেষ হবার পর আমি ওকে ওর বরকে কল করতে বললাম কারণ আমেরিকাতে কল করার জন্যে আমি কার্ড কিনেছিলাম কিন্তু ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল যে সে ওর বরের নাম্বার জানেনা কারণ সবসময় ওর বরই কল দিত। প্রায় প্রতিদিনই ওর বর কল দিত সেজন্যে ওর কোনদিন কল করার দরকার পড়েনি। আমি একটু অবাক হলাম ওর কথায়।

হঠাৎ করেই কেমন যেন একটা নিরবতা নেমে এল রুমটাতে। কিছুক্ষণ আমি চুপ করে রইলাম কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম যে বাব মার সাথে কথা বলার পর ওর মন উদাস হোয়ে আছে। তাছাড়া আমি নিশ্চিত যে ও অনেক কিছু ভাবছিল। ও যে ওর মার কাছে মিথ্যে বলল তাতেই আমি বুঝে নিলাম যে সে অনেক মনঃকষ্টে আছে। একজন ২২/২৩ বছরের ইয়াং মেয়ে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ২৬/২৭ বছরের ইয়াং লোকের সাথে একি রুমে থাকবে এটা ভাবা আমাদের মতো দেশের কারো পক্ষে সম্ভব না।

মেয়েরা সাধারনত ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তা করে। আমার কেন যেন মনে হোল যে ও কি আমার সাথে একি রুমে থাকার ডিসিশনতা নিয়ে কিছু ভাবছে। আমি এটাও নিশ্চিত যে ওর বর যদি জানতে পারে যে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সাথে বেশ ক’টা দিন আর রাত একি রুমে কাটিয়েছে তবে একি রুমে থাকাটা কিভাবে নেবে সেটা নিয়েও ভাবছে।

আমি ওকে বিছানার উপরে উঠে বসতে বলাতে বিছার উপরে উঠে বসলো। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। ভালো করে পড়তে চেষ্টা করলাম যে দেখি সেখানে কি লিখা আছে। আমি মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারি কিন্তু কোনমতেই ওর চোখে আমি সন্দেহর কোন ছায়া দেখতে পেলাম না। ভারী পর্দাটা একটু সরে ছিল আর সেই ফাঁক দিয়ে আলো আসছিল বলে আর লাইট অন করে দেবার দরকার হোলনা। হাল্কা অন্ধকারে ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে আমি কোনকিছুই দেখতে পেলাম না।

আমি ওকে বললাম,” শোন, আমরা যে সিচুয়েশনে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে আমরা ইচ্ছে করে আসিনি । আমাদের ভাগ্য আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। আমার যা মনে হয় সেটা হোল আমরা এখানে ১০০% ভাগ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। সেজন্যেই আমার মনে হয় যে আমরা যদি একে অপরের সম্পর্কে জানি তাহ’লে আমাদের সময়টা ভালো কাটবে। ওমান দেশটা যে ধু ধু মরুভুমি একেবারে তা নয়। এখানে অনেক কিছু দেখার আছে। আমরা সী বীচ দেখতে যেতে পারি । এই হোটেল থেকে একেবারেই কাছে। ইন ফ্যাক্ট এই রুম থেকেই গালফ অফ ওমান যা কিনা অ্যারাবিয়ান সাগরের একটা অংশ সেটা দেখতে পাবে । আমি হাত ধরে ওকে টেনে তুললাম সাগরের নীল জল দেখানোর জন্যে । জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সাগরের নীল জল দেখে ওর মুখ খুশিতে ভরে গেল।

জানালার কাছে এসে ও পর্দাটা আরো একটু ওপেন করে দিল । রুমের ভেতরে হালকা অন্ধকার আর বাইরে থেকে আসা তীব্র আলোর ছটা এসে ওর মুখের ওপরে এক আশ্চর্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করলো। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম কিন্তু ওকে বুঝতে দিলাম না। যাকে বলে চুরী করে দেখা। আমার কেবলি মনে হচ্ছিলো যে আমি ওকে একটু ছুঁয়ে দেখি, বুকের ভেতরে টেনে নেই দম বন্ধ করা এক তীব্র ভালোবাসায় কিন্তু পরক্ষনেই আমি নিজেকে বকা দিলাম এমন করে ভাবার জন্যে । আমার ওভাবে ভাবাটা ঠিক নয়।

আমি খেয়াল করছিলাম যে আমার সামনে সে বেশ অনেকটাই ফ্রি হোয়ে গিয়েছে আর আমি সেভাবেই চাচ্ছিলাম। আমার এক মুহূর্তের অসাবধানতা সবকিছু আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে। আমি নিজের কাছে নিজেই বললাম আমি এমন কিছু না করি যাতে আমার সম্পর্কে ওর খুব নীচু ধারনা না হয়। আর যদি ভাগ্য দোষে এমন হোয়েই যায় তবে আমি নিজেকে কোনদিন মাফ করতে পারবো না। কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ও আবার এসে বিছানার উপরে বসলো। এবার ও একটা বালিশ নিয়ে হেড বোর্ডের উপরে হেলান দিয়ে বসলো।

আমিতো বিছানার উপরে আধা শোয়া অবস্থায় ছিলাম। এক পা ছিল কার্পেটের উপর। এবার আমি বিছানার উপরে উঠে এলাম কিন্তু যথেষ্ট জায়গা রেখে নিলাম দু’জনের মাঝে। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম যে ও কি জোকস শুনতে লাইক করে কিনা। ও যথেষ্ট উৎসাহের সাথে বলল যে সে জোকস লাইক করে । আমি বেশ কতোগুলো ক্লিন জোকস শুনালাম আর ও হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল। হাসতে হাসতেই বলল,” আপনি এত জোকস মনে রাখতে পারেন কিভাবে?” আমি হেসে বললাম,” আমি আর অনেক কিছু মনে রাখতে পারি। এই যেমন তোমাকে আমি কোনদিন ভুলে যাবনা।“ ও আমার হাতের উপরে হাত রেখে বলল,” সত্যি বলছেন তো? আমিও কোনদিন আপনাকে ভুলে যাবনা।“ আমি বললাম,” মনে থাকে যেন।“

smile

ও যখন হাসছিল তখন ওকে দেখতে কি ভীষণ ইনোসেন্ট আর পবিত্র লাগছিল। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম ওর মুক্তোর মতো দুধ সাদা দাঁত, পারফেক্টলি শেপড আইব্রাও সবকিছু যেন ঠিক জায়গামতো আছে। হটাৎ করে ও আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি বিয়ে করেছি কিনা। আমি ওর ভুলে যাওয়াটাতে একটু অবাকই হোলাম। ওর মাথায় একটা টোকা দিয়ে বললাম ,” হ্যালো উপরে কি কিছু আছে? আমি না তোমাকে আমার ওয়াইফের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম।“ “ ওহ স্যরি । আসলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতেই সময় পার করে দিলাম আর সেজন্যে ই আপনার ওয়াইফের সাথে কথা হয়নি।“

eye-2

আমি ওর বর সম্পর্কে জানতে চাইলাম কিন্তু খেয়াল করলাম যে ও ওর বরের ব্যাপারে কথা বলতে উৎসাহী না। তবুও আমি ওকে টিজ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিভাবে ফোনের এপাশ আর ওপাশ থেকে কথা বলে বিয়ে হয় তাও আবার কেউ কাউকে না দেখে সেটা বুঝতে আমার রীতিমতো কষ্ট হোচ্ছিল। মুখটা মলিন করে ও বলল,” এটা ছিল আমার ফ্যামিলি ডিসিশন আর আমার তীব্র আপত্তির কথা কেউ শোনেনি । আমি শুধু আমার আব্বু আম্মুর দেয়া কথার মান রেখেছি।“

“জানেন আজও আমার কাছে মনে হয় যে আমি বোধ হয় স্বপ্ন দেখছি। ঘুম ভেঙে যাবে আর স্বপ্নও ভেঙে যাবে। আমার বিয়ের দিন অনেক লোক হোয়েছিল। ইমাম সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি বিয়েতে রাজি কিনা ।আমি কিছুই বললাম না ।পেছন থেকে কে যেন কবুল বলল আর ইমাম সাহেব সেটাকেই লম্বা ঘোমটার ভেতর থেকে আমার আওয়াজ বলে মেনে নিল। টেলিফোনের ওপাশ থেকে আমার বর কবুল বলল । ইমাম সাহেব ক’টা সুরা পরলেন আর আমার হোয়ে গেল যাবজ্জীবন ।“

“কিছু বোঝার আগেই শেষ। অথচ আমার কতো সাধ ছিল যে কাউকে জেনে, কারো সাথে সামনা সামনি পরিচয় হবার পর কিছুদিন ওই লোকটাকে জানব, বুঝব, হয়ত ভালো ও বাসবো তারপর বিয়ে।“ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল ও। দেখলাম ভীষণ সুন্দর চোখদুটো থেকে টপ টপ করে ক’ফোঁটা অশ্রু পড়লো । আমি হাত এগিয়ে ধরে ফেললাম সেই অশ্রুবিন্দুগুলো। ও তাকিয়ে দেখল । আস্তে করে আমার হাত ধরে মুঠোতে ধরে রাখা অশ্রুবিন্দুগুলো দেখবে বলে আমার হাত ওপেন করে ফেলল। খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই ভেজা হাতের দিকে। আমারও চোখ ভরে গেল অশ্রুতে। ও বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল যে আমার চোখ থেকেও নামবে বৃষ্টি ধারা।

Tear Drop

ঠিক আমারি মতো করে সেও ধরে ফেলল আমার চোখ থেকে নেমে আসা দু ফোঁটা চোখের জল । আমি শুধু বললাম,” না ধরলেই পারতে। শোধ করে দিলে। নাহয় থাকতে আমার কাছে চির ঋণী হোয়ে। “ কেমন যেন হোয়ে গেল পরিবেশটা । দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বিদেশের এক হোটেল রুমে এভাবেই শুরু হোল এক নতুন সম্পর্কের যার জন্যে দু’জনের কেউ কোন প্ল্যান করেনি। পুরোটই হোল যাকে বলে হঠাৎ অসময়ে বৃষ্টি আসার মতো । পরিবেশটা হাল্কা করার জন্যে আমি বললাম,” চল টেলিফোন ব্রাইড। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে।“ ও আমাকে একটা কিল মারার চেষ্টা করল কিন্তু আমি লাফ দিয়ে দূরে সরে গেলাম।

“চলেন,আমারও খুব খিধে পেয়েছে”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *