লাভ ইন ওমান পর্ব – ৯

আমাদের লাগেজ বেল বয় নিয়ে আমাদের তাকে ফলো করতে বলল। লিফট নিয়ে ১৭ তলায় এল সে আর আমরা তাকে ফলো করে রুমে এলাম। আমাদের সাহায্য করার জন্যে থ্যাংকস জানিয়ে ক’টা ডলার টিপস দিলাম। বেল বয় চলে যাবার পর দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। রুমের ভেতরে ঢুকে চোখ জুড়িয়ে গেল । স্পারক্লি ক্লিন, হালকা আলোতে কেমন যেন একটা রোম্যান্টিক ভাইব সারা রুমটাকে ঘিরে রেখেছে। মনে হচ্ছিলো যে হানিমুন সুইট। আমি ভারী পর্দাটা একটু সরিয়ে দিতেই পুরো রুম সাইজ ডোর দিয়ে ঝকমকে আলো চলে এল। দেখলাম যে সারা মাস্কাট শহরটা দেখা যাচ্ছিলো ।

Hotel-room

ডোরটা ওপেন করতেই গরম বাতাস লাগলো গায়ে । আমি ওকে ডাকলাম । বললাম,” যাক ভালো ই হোল এই ব্যালকনিটা থাকাতে। আজ সন্ধ্যে বেলায় এখানে বসে কফি বা চা খাওয়া যাবে ।“ আমি আবারো ডোরটা বন্ধ করে ভেতরে ঢুকলাম । দেখি ও বসে আছে বিছানার উপরে । মুখে খুব চিন্তার ছাপ। আমি বললাম,” কি ব্যাপার ? মন খারাপ কেন ?” ও কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইল । আবারো জিজ্ঞাসা করাতে আর কিছু না বলাতে আমি বললাম,” মন খারাপ কোরনা। যেভাবে ঘটনাগুলো এগুচ্ছে তাতে আমাদের কারোরই কিছু করার নেই। আমাদের হাত পা বাঁধা ।

ভাগ্য ভালো যে আমাদের একি রুমে থাকা নিয়ে কেউই কিছু বলেনি। নইলে তুমি কোথায় কোন হোটেলে একা মরে পড়ে থাকতে তা কেউ জানতে পারতনা। সেজন্যে এই ভেবে খুশি হও যে তুমি ভালো আছো ।“ করাচী ছাড়ার পর ৬ ঘণ্টার মতো পার হোয়ে গেছে । রুমের ভেতরে ঝুড়ি ভরা ফ্রুট দেখে বেশ ভালো লাগলো। যাকে ইংরেজিতে বলে আই ওয়াজ ডিলাইটেড টু সী দ্যাট ।

আমি ওকে কাপড় চেঞ্জ করতে বলাতে সুটকেস ওপেন করে প্রয়োজনীয় কাপড় নিয়ে ও বাথরুমে ঢুকল। আর আমি কিং সাইজের বেডের উপরে বসে পড়লাম। আমি চিন্তা করছিলাম যে কি হচ্ছিলো। দিনটা শুরু হোল বেশ ভালোই কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই কেমন যেন উলটা পাল্টা হোয়ে গেল। বিদেশে এসে এভাবে মাঝপথে আটকা পড়ে যাবো এটা আমি কখনই ভাবিনি। সত্যি কথা বলতে কই, আমার কোন ধারণাই ছিলনা যে এরকম কিছু হোতে পারে ।

Bathroom 1

ভাবছিলাম যে ঢাকায় টেলিফোন করে জানাতে হবে যে আমি ভালো আছি। কোন চিন্তা করার দরকার নেই। ওর বাসাতেও কল করতে হবে। ভাবতে ভাবতে কখন যে একটু তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। হটাৎ ওর ডাকে তন্দ্রা ভেঙে গেল। “ শুনছেন, সুটকেস থেকে আমার টাওয়েলটা প্লিজ দেবেন ?” বাথরুম ভরা টাওয়েল আছে কিন্তু তবুও ওর নিজেরটা কেন চাই সেটা বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম,” বাথরুমেইতো আছে এতোগুলি সেখান থেকে একটা ইউজ করো। “ “ না, আমার আগে কে জানে কে ইউজ করেছে আর আমি কিনা ওদের ইউজ করা জিনিস ধরবো ?” শুনে আমি হাসবো নাকি কাঁদবো সেটা বুঝলাম না।

খানিকটা দ্বিধা নিয়েই ওর ছোট সুটকেসটা খুলে ওর প্রানপ্রিয় টাওয়েলটা দরোজার ফাঁক দিয়ে দিলাম ওকে। ক’মিনিট পর ও বাথরুম থেকে বের হোয়ে এল একেবারে ভিযে একাকার। ওর অবস্থা দেখে আমিতো হেসেই মরি। কোনমতেই হাসি চাপিয়ে রাখতে পারলাম না। আমি কিছু বলার আগেই আমাকে টেনে বাথরুমে নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি যে ওভারহেড শাওয়ার অন ছিল সেটা ও বুঝতে পারেনি । ও পা ধোয়ার জন্যে যখনই বাথটাবে দাঁড়িয়ে নীচের ফসেট অন করেছে আর অমনি উপরের শাওয়ার থেকে জল স্প্রে করে পড়ে ওকে ভিজিয়ে দেয়। পুরোপুরি ভিজে যায় কারণ কোনটা দিয়ে জল বন্ধ করবে সেটা ও খুঁজেই পায়নি।

হাসি দেখে বলে উঠল,” নেক্সট টাইমে যখন আপনি এইভাবে ভিজবেন তখন আমিও আপনার মতো করে হাসব।“ আমি হাসতে হাসতে বললাম,” ওকে সেটা দেখা যাবে। আগে তুমি তোমার ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে নাও। নইলে বলা যায়না যদি আবার ঠাণ্ডা লেগে যায়।“ ও আরেকটা ড্রেস নিয়ে বাথরুমে ঢুকে চেঞ্জ করে এলো।

আমি আর কাপড় চেঞ্জ করলাম না কারণ নীচে রেস্টুরেন্টে যেতে হবে খাওয়ার জন্যে প্লাস ফোন কার্ড কিনতে হবে ঢাকা আর নিউইয়র্ক কল করার জন্যে । ওর বর নিশ্চয়ই চিন্তা করবে যখন সে এয়ারপোর্টে যেয়ে ফিরে আসবে। আর এদিকে আমার জন্যে কেউ নিউইয়র্কে বসে চিন্তা না করলেও ঢাকাতে সবাই চিন্তা করবে । হিসেব করে দেখলাম যে তখনই যে কল করে জানাতে হবে সেটা নয়। হাতে আরো ২০ ঘণ্টার মতো সময় আছে। কারণ সবাই জানে যে কখন আমরা নিউইয়র্ক পৌঁছাবো আর তখন যদি জানতে না পারে যে কেন আমরা কল করছিনা তখন থেকে চিন্তা করবে সবাই যে কি হোল। তাছাড়া জানতেও চাইবে যে ব্যাপারটা কি সেজন্যে পরেই কল করবো আরও একটু ইনফরমেশন পেয়ে নেই।

আমি ফলের ঝুড়ি থেকে একটা অ্যাপেল নিয়ে ও কিছু বোঝার আগেই আমি ওর দিকে ঢিল দিয়ে বললাম,” ক্যাচ” ও কিছু বোঝার আগেই অ্যাপলটা সোজা ওর মাথায় যেয়ে লাগে। ও উহ বলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো। আমিতো একেবারে বোকা হোয়ে গেলাম। “ ওহ আই অ্যাম সো স্যরি। আমি বুঝতে পারিনি। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও” বলে ওকে টেনে বিছানার উপড়ে বসালাম । আমার অবস্থা দেখে হটাৎ করে ও হেসে ফেলল। আর বলল, “কেমন বোকা বানালাম শুনি ?’

আমি বললাম,” আমাকেতো চেননা মেয়ে, কড়ায় গণ্ডায় শোধ নেবো।“ ও অ্যাপেলটা নিয়ে সাথে আসা ছোট একটা চাকু দিয়ে খোসা ছাড়াতে লাগলো। আমি ওর খোসা ছাড়ানো দেখে বুঝলাম যে এই মেয়ে কোনোদিন অ্যাপেলের খোসা ছাড়ায়নি । অর্ধেকের বেশী ও কেটে ফেলে দিল। আমি বললাম,” এইভাবে কাটলে অ্যাপেল আর খেতে হবে না। শুধু ওর বিচি খেতে হবে। “ “ তাই নাকি ? তাহোলে আর খেতে হবে না বলে ও অ্যাপলটাকে স্লাইস কোরে খেতে লাগলো কিন্তু আমাকে দিল না এক টুকরোও ।“

1346848075_8970_lightning10

আমি বললাম, “কেমন পাষাণী তুমি। তোমার সামনে একজন ক্ষুধার্ত মানুষ বসে আছে আর তুমি কিনা… যাও , ভাগ তোমার বরের কাছে।“ শুনে ও হেসে ফেলল,” আপনি তো খুব ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল করতে পারেন” বলে ও আমাকে দুটো স্লাইস দিল।
আমার মনের মধ্যে চলছিল এক উথাল পাথাল। যতোই ওকে দেখছিলাম ততোই যেন কেন দেখতে ইচ্ছে করছিল। বার বার মনে হোচ্ছিলো যে ওসব চিন্তা করাও আমার জন্যে ঠিক না কিন্তু কি এক অদৃশ্য টানে আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ডুবছি আর ডুবছি। ভেসে ওঠার জন্যে আমি প্রাণপণে হাত পা ছুঁড়ছি কিন্তু মনে হোচ্ছে আমাকে ও তার চেয়েও অনেক বেশি জোরে আমাকে টানছে ওর দিকে।

কেন এমন হয় ? কেন আর কোন সে শক্তি যাকে দেখা যায়না, ছোঁয়া যায়না কিন্তু তার হাত থেকে ছুটে বের হোয়েও যাওয়া যায়না। কিভাবে সম্ভভ যাকে কোনদিন দেখিনি, যাকে মাত্র ক’ ঘণ্টা আগেও চিনতাম না ঠিক তার দিকেই ছুটে যাচ্ছি আমার অতিত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সব কিছু উপেক্ষা করে কিন্তু আমাকে যে বের হোতেই হবে এই আকর্ষণের হাত থেকে। আমি ডুবে যাচ্ছি কিন্তু কোন তল খুঁজে পাচ্ছিনা।

“কি দেখছেন এমন করে ?” ওর কথায় বাস্তবে ফিরে এলাম। “ না কিছুনা” বলে পাশ কাটাতে চাইলাম কিন্তু ও জেদ ধরল শোনার জন্যে । আমি মৃদু হেসে বললাম,” আচ্ছা পরে বলব।“ প্রমিজ ? “ বললাম,” আচ্ছা বাবা প্রমিজ।“ আমি বললাম, “কলিং কার্ড কিনতে হবে বাংলাদেশ আর আমেরিকা কথা বলার জন্যে । তুমি থাকো আমি এক দৌড়ে কার্ড কিনে আসছি।“ “ না না প্লিজ আমাকে একা রেখে যাবেন না। আমাকে নিয়ে যান। “ আমি হেসে বললাম,” পাগল নাকি ?রুমে থাকতে ভয় কি?” কিন্তু কে শোনে কার কথা? ঠিকই আমার সাথে আঠার মতো লেগে রইল।

লিফটের বাটন প্রেস করে দাঁড়িয়ে রইলাম দু’জনে । গতকাল সন্ধ্যে পাকিস্তান থেকে সেই যে আমার হাত ও শক্ত করে ধরেছিল এবারো তাই করলো। বললাম,” ভাব দেখি এখন যদি তোমার বর এখানে চলে আসতো আর তোমাকে এইভাবে আমার হাত ধরা অবস্থায় দেখত তা’হলে কেমন হতো ?” বলার সাথে সাথেই ও আমার হাত ছেড়ে দিল । মনে হোল যেন কেউ ওকে ইলেকট্রিক শক দিল । আমি ওর অবস্থা দেখে হেসে ফেললাম। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি যে ওর চোখ জলে ভরে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *