লাভ ইন ওমান পর্ব – ৮

একথা শুনে আমাকে একটা খামচি মেরে দিলো । আমি হাসতে হাসতে বললাম,” শোন মেয়ে, খামচি মারতে হয় নিজের জামাইকে মারো গিয়ে… পরের জামাইকে খামচি মারছ কেন ?’ আবারো কেমন যেন অসহায়ের মতো আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল আর আমিত

ঘণ্টা খানেক পর আমরা মাস্কাট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, সালতানাত অফ ওমানে নামলাম । ওর পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আর মনে হোল যে করাচীর চেয়ে অনেক ছোট সিটি এই মাস্কাট । গালফ অফ ওমানের সাথেই লাগানো এই সিটি । একদিকে নীল জল আর একদিকে ঘন ক্রিম কালারের মাটি। আমাদের দেশের মতো সবুজ না। তবে এরা চেষ্টা করছে সবুজ বিপ্লব করার জন্য। মাঝে মাঝেই বেশ সবুজের ছড়াছড়ি ।এদের জীবন আগে খুবই কথিন ছিল কিন্তু পেট্রো ডলারের কারণে ওদের জীবন এখন অনেক ঝামেলাহীন। উপর থেকে দেখে বেশ ছিমছাম মনে হোল কিন্তু সবকিছুই কেমন যেন ঘোলাটে ।

Muskat at night

মাস্কাট হোল সালতানাত অফ ওমানের রাজধানি শহর, আর সবচেয়ে বড় শহর। দক্ষিন পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত আরব দেশগুলোর মধ্যে মাঝারি সাইজের একটা দেশ। আর আরবিয় পেনিন্সুলার দক্ষিন পূর্ব অংশে অবস্থিত এই মাস্কাট সিটি.
সালতানাত অফ ওমানের উত্তর পশ্চিমে হোল ইউনাইটেড আরব এমিরেট্‌স, বিশাল সৌদি আরব হোল পশ্চিম দিকে, মনে হবে যেন সৌদি আরব ওমানকে গিলে খেতে চাইছে । আর ইয়েমেন হোল দক্ষিন পশ্চিমে । দক্ষিন পূর্বে আরবিয়ান সাগর আর উত্তর পূর্বে হোল গালফ অফ অমান। আমি অনেকটা অবাক হোয়েই খেয়াল করলাম যে প্লেনটা এয়ারব্রিজ বা ওয়াকওয়ে্তে না থেমে বেশ কিছুটা দুরে থামল । আমার মনে কেমন যেন একটু খটকা লাগলো । নইলে এয়ারকনডিশনড ওয়াকওয়ে বাদ দিয়ে কেন টার্মিনাল থেকে দুরে প্লেন থামাবে। প্লেনের দরোজা খুলে দেয়া মাত্রই গরম বাতাস এসে জানিয়ে দিল যে ওই সময়ে ওমানে আগুনের মতো গরম না হলেও আমার জন্যে যথেষ্ট গরম । আমার মনে হোল যে কম করে হলেও ৯০ ডিগ্রি হবে ।

ও আমাকে জিজ্ঞেসকরল যে এই শীতের দিনে এত গরম কেন? আমি হাসতে হাসতে বললাম,” এখানে শীতকাল বলে কিছু নেই। এমনিতে সারা বছরই অনেক গরম থাকে শুধু এসময়েই যাও বা একটু আরাম থাকে আর এখন ঠিক তেমনি আরামের গরম ।“ শুনে মনে হোল যে সে কনফিউজড । আমি ওকে ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হেল্প করলাম কারণ হাই হিল পরে আর যাই হোক প্লেনের সিঁড়ি দিয়ে নামাটা ইজি না।

আমাদের নেয়ার জন্যে তিন, চারটা বাস এসে হাজির হোল। আমি ওর ব্যাগ নিয়ে সাথে আমার ছোট ব্যাগটা নিয়ে নেমে বাস এ উঠলাম। এয়ারকনডিশনড বাস। আমাদের বাস ছাড়ার সাথে সাথেই দেখলাম বেশ কতগুলো পুলিশ বা আর্মির গাড়ী এসে প্লেনটাকে ঘিরে রাখল। আমি বুঝে গেলাম যে কিছু একটা বড় গোলমাল হোয়েছে । বাস থেকে নেমেই ঢুকে পড়লাম এয়ারকনডিশনড টার্মিনালের ভেতরে। আহা শরীরটা একদম জুড়িয়ে গেল।

highways in Muskat

আমাদের রিসিভ করার জন্যে বেশ ক’জন ইরাকি এয়ারওয়েজের লোকজন আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল । আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ওরা । আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম চোখে মুখে এক প্রশান্তি। আমারও বেশ ভালো লাগলো । কিন্তু আমার মনে চলছে একসাথে অনেক কিছু । আমি চারিদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি যে ব্যাপারটা কি হোতে পারে। কেন ওভাবে প্লেনটাকে ঘিরে ধরল । কেমন যেন একটা থমথমে ভাব চারিদিকে। কি হোতে পারে ? বেশ কিছু পুলিশ আর আর্মির লোকজন দেখলাম যা কিনা নরমাল না।
আমাদের ইরাকি এয়ারওয়েজের কাউনটারে নিয়ে আসা হোল । সেখানে দেখলাম যে ইতিমধ্যেই বেশ বড় একটা লাইন লেগে আছে। একটু হৈ চৈ হোচ্ছে । সবারই একি প্রশ্ন যে কেন ইরাকি এয়ারওয়েজ চলছেনা।

ফাইনালি একজন হাই অফিশিয়াল হবে এমন একজন সবাইকে চুপ হোতে বলল। যা বলল শুনেত আমার টেনশন বেড়ে গেল। ও আমাকে জিজ্ঞাসা করল যে কি বলল। ওকে বোঝালাম যে কুয়েতের সাথে যুদ্ধ শুরু হোয়ে গিয়েছে আর সে জন্যেই কুয়েতের সাপোর্টে আমেরিকা ইরাকের সাথে যুদ্ধ করছে। আমেরিকা বিশেষ করে ইরাকের ভেতরে অনেক বোমা ফেলছে আর সেজন্যে ইরাকের আকাশ দিয়ে সব দেশের প্লেন ফ্লাই করা নিষিদ্ধ করা হোয়েছে। আর ইরাকি এয়ারওয়েজকে একেবারে বন্ধ করে দেয়া হোয়েছে যাতে কোন ইরাকি প্লেন কোথাও উঠা নামা না করতে পারে।

যেহেতু ইরাক থেকে ওমান বেশ দূরে তাই আমাদের এই নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসা ছাড়া কোন উপায় ছিলনা। শুনে ওর কান্না কান্না ভাব। আমি ওকে বললাম,” চিন্তা করোনা। এটা সাময়িক ব্যাপার। আমি নিশ্চিত যে কালকের মধ্যেই আমরা এখান থেকে ফ্লাই করতে পারবো। তাছাড়া ইরাকি এয়ারওয়েজের ওই অফিসার তো বললই যে আমাদের থাকা, খাওয়া, ভিসা এবং পরবর্তী ফ্লাইট নিয়ে কোন অসুবিধাই হবেনা। ওরা আরও বলল যে আমাদের কমফোরটের জন্যে সব রকম চেষ্টা তারা করবে।“ শুনে ও কিছুটা সান্ত্বনা পেলেও ওর চিন্তা কাটল না সেটা আমি ওর মুখ দেখেই বুঝে গেলাম। কি হোতে পারে সেটা.

যাই হোক বেশ খানিকক্ষণ ওয়েট করার পর আমাদের ডাক এলো । আমার আমেরিকান পাসপোর্টের কারনেই হোক আর আমি নিউইয়র্ক যাচ্ছি বলেই হোক আমাকে ওরা সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গে ল। আমি একটু ভয় ও পেয়ে গিয়েছিলাম যে আবার না ওকে আমার কাছ থেকে দুরে নিয়ে যায়। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে যদি ওরা ওকে আলাদা অন্য কোন হোটেলে নিয়ে রাখে তবে একটা সিনক্রিয়েট হবেই। ও কান্নাকাটি করে সব লোক জড়ো করে ফেলবে । আমি ওকে বললাম,” শোন, আমি এই অবস্থার জন্যে তৈরি ছিলামনা । সেজন্যে আমি যা বলি তাই করবে। আমার হাত খুব শক্ত করে ধরে রাখো । যদি জিজ্ঞেসকরে তবে শুধু বলবে যে নো ইংলিশ । আর আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলব যে তুমি আমার স্ত্রী । তুমি শুধু মাথা নাড়িয়ে যাবে । বাকিটা আমি সামলে নেব । “

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম যে এই মেয়ে আমাকে ডোবাবে । আমার মনে হয় ও জীবনে কোনদিন মিথ্যা কথা বলেনি আর যদিও বলে থাকে তবে আমি নিশ্চিত যে সে সবসময়ই ধরা পড়ে যেতো । আমিতো মুখে যদিও বললাম কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি ঠিকই ভয় পাচ্ছিলাম যে ওকে ওরা হয়তো অন্য হোটেলে নিয়ে যাবে। ওখানে সব মিলে প্রায় ৫০০ লোক হবে যাদের জন্যে ইরাকি এয়ারওয়েজের হোটেল রুম লাগবে ।

একসময় আমাদের ডাক এল। আমার মনে হয় আমাদের এমনভাবে গায়ের সাথে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে কথা বলা এসব দেখে ওরা ঠিকইা ভেবেছে যে -আমরা স্বামী আর স্ত্রী। তাছাড়া আমি এটাও ভাবলাম যে ওদের একটা রুম কম লাগবে সে চিন্তাটাও হয়তো করেছে। অথবা ওরা কোনকিছুই চিন্তা করেনি। আমার একটা ব্যাপারে চিন্তা ছিল যে ওর বাংলাদেশি পাসপোর্টে বাবার নাম লিখা ছিল ওর স্বামীর নাম নয়।

আর যেহেতু ওর কাছের যে সীলড বড় হলুদ রঙের এনভেলাপ ছিল সেটা একমাত্র আমেরিকার পোর্ট অফ এন্ট্রিতেই শুধু ওপেন করা যাবে । সেজন্যে আমি জানতাম যে মিথ্যে বললেও ধরা পরার ভয় কম ছিল। পরে খেয়াল করলাম যে ওই লোকগুলোতো শুধু আমাদের হোটেলের বাবস্থা করছিলো । ইমিগ্রেশনের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না। তবে হ্যাঁ আমাদের অন এরাইভাল ভিসা দিয়ে দিল ১৫ দিনের জন্যে ।

কোথাও কেউ কোনকিছুই জিজ্ঞেস করলো না। একটা ব্যাপারে আমি একটু চিন্তিত ছিলাম আর সেটা হোল যেহেতু আমেরিকা ইরাক আক্রমন করেছে তাতে হয়তো আমাকে ওরা খারাপভাবে দেখবে কিন্তু বাস্তবে তা তো হোলই না বরং শুধু আমাদের নিয়ে গেল মাস্কাট শেরাটন হোটেলে । আমার ধারনাটাই বদলে গেল ইরাকি এয়ারওয়েজ সম্পর্কে । তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার ছিল আর সেটা হোল যে ওমানের সাথে আমেরিকার খুব ভালো সম্পর্ক । আমেরিকা গালফ অফ ওমান ইয়ুজ করে যুদ্ধ জাহাজের সহজ চলাফেরার জন্যে । ওমানি এয়ারবেস ইউজ করে রিফুয়েলিং অফ এয়ারক্রাফট ।

Muskat Sheraton

আমাদের লাগেজগুলো পিক আপ করতে হোল যদিও নিউইয়র্ক পর্যন্ত ডিরেক্ট ট্যাগ লাগানো ছিল। খেয়াল করলাম যে বেশিরভাগ ইরাকি এয়ারওয়েজের যাত্রীদের বাসে করে বিভিন্ন হোটেলে নিয়ে যাওয়া হোল। শুধু আমাদের জন্যে একটা মিনিভ্যান এলো আর আমাদের নামিয়ে দিল মাস্কাট শেরাটনে।

মাস্কাট শেরাটন হোটেলটা বেশ সুন্দর বাইরে থেকে কিন্তু ভেতরে আরও বেশি সুন্দর। আমার হাত শক্ত করে ধরে যখন ইরাকি এয়ারওয়েজের অফিসারের সাথে হোটেলের ভেতরে ঢুকলাম, আমার দারুণ ভালো লাগলো প্রথম দেখেই। আমি খেয়াল করছিলাম ওর দিকে। শক্ত করে হাত ধরে ফিস ফিস করে বলল, “ মাগো, দেখেন না কি সুন্দর ভেতরতা। আমি জীবনেও এমন সুন্দর হোটেল দেখিনি ।“ আমি বললাম,” শোন আমিও দেখিনি কারণ আমেরিকার দামি দামি হোটেলেও এমন রাজকীয় কিছু দেখা যায়না। “ আমাদের ১৭ তলার কোনার দিকের একটা রুম দিল। সাথে আনলিমিটেড ফুড ভাওচার আমাদের দু’জনের জন্যে ।

সত্তি কথা বলতে কি আমি যতটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের দিল ইরাকি এয়ারওয়েজ । আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিল ইরাকি অফিসার যে কোন প্রবলেম হলে আমি যেন তাকে কল করি। তার বিজনেস কার্ড দিল আর বলল যে আমাদের যা ইচ্ছা তা যেন খেতে পারি। বিল নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি জানতে চাইলাম যে আমাদের ফ্লাইট কবে হবে কিন্তু সে কোন কিছু বলতে পারলনা। শুধু বলল যে মাত্রই কয়েক ঘণ্টা আগে এসব হোয়েছে ওদের কাছেও তেমন কোন ইনফরমেশন নেই। যাবার আগে অফিসার আমাদের উইশ করে চলে গেল। আমি ভেবেছিলাম যে আমাকে হয়তো ভালো ভাবে ট্রিটমেন্ট নাও করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে হোল ঠিক তার উলটো ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *