লাভ ইন ওমান পর্ব – ৭

কিছুটা সঙ্কোচের ছায়া দেখতে পারছিলাম ওর চোখে যে প্লেনের ভেতরে কেউ কি পা উঠিয়ে বসে এমন একটা। আমি হেসে বললাম, “ডোন্ট ওয়রি… অনেকেই লং জার্নিতে পা উঠিয়ে বসে। এই দেখ আমি পা উঠিয়ে বসি।” বলে আমি পা উঠিয়ে একটু বাঁকা হোয়ে বসলাম। দেখে ও হেসে ফেলল। আস্তে আস্তে দু’টো পা একটু এগিয়ে দিয়ে সুন্দর মুখটা ওর আরো সুন্দর লাগলো। ধব্ ধবে সাদা দুটো মানিকিয়র করা পা ওর। দারুণ গভীর নীল রঙের নেইল পলিশের উপরে সাদা দাগ দেয়া ফ্রেঞ্ছ ডিজাইন করা নখগুলো আমি এক সেকেন্ডেই খেয়াল করলাম। স্টাইল জানে মেয়েটা।

ব্রেকফাস্ট সারভ করল সুন্দর দেখতে দু’জন এয়ার হোসটেস। বেশ খানিকটা স্ক্রাম্বল এগ উইথ মাশরুম, ক্রসান্ত, একটা বাটিতে কিছু মিক্সড ফল, ম্যাঙ্গ জুস আর চা অর কফির জন্যে খালি কাপ। ট্রে ভর্তি খাবার দেখেতো ও বোকা হোয়ে গেল আর আমার বেশ হাসি পেল। “এত্ত খাবার কি আর আমি খেতে পারবো?” আমি ইচ্ছে করেই ওকে ভয় দেখালাম, “শোন খাবার না খেলে তোমাকে ওরা প্লেন থেকে নামতে
দেবেনা।”

কেমন যেন এক রাজ্যের ই্নোসেন্স নিয়ে সে বলল, “সত্যি? তা’হোলে আমার কি হবে? আমিতো সারা দিনেও সব শেষ করতে পারবোনা।” আমার হাসি হাসি মুখটা দেখে ও বলল,”আমাকে বোকা বানাচ্ছেন নাতো?” আমি বললাম, “মোটেই না। ঠিক আছে যা খেতে পারনা তা আমাকে দিও। তোমাকে তো বাঁচাতে হবে।” ততক্ষনে ও বুঝে গিয়েছিল যে আমি ওর সাথে মজা করছি। “মাশরুম দেখে বলল, “ওটা কি ? আমিতো জীবনেও দেখিনি এরকম ভেজিটেবল।”

মনে হোল একবার বলি যে বাংলায় আমরা বলি ব্যাঙের ছাতা যা কিনা একরকম ছত্রাক উদ্ভিদ। কিন্তু আমি জানি যে ওর আর খাওয়া হবেনা তাই উত্তর দিলাম যে ওটা একরকম ভেজিটেবল নাম মাশরুম আর এটার বাংলা নাম জানিনা।” আমাকে বেশিরভাগ স্ক্রাম্বলড এগ দিয়ে দিল। আমি বললাম, “ক্ষিধে কিন্তু ঠিকি লাগবে তখন কিন্তু ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে পারবেনা।” “যান আমার হাজার ক্ষিধে পেলেও আপনাকে বলবনা।খুশি?”

আমি হাসতে হাসতে বললাম, “তুমি খেতে পারবেনা আর আমার পেটে কি রাক্ষস আছে নাকি যে আমি সব খেয়ে ফেলব?” ও আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটু হেসে বলল,”চুপ, কথা বলবেন না। জাস্ট ইট।” আমি ওর কথা বলার ভঙ্গিতে একটু সেন্স অফ বিলংগিং ফীল করলাম। কেমন যেন একটু অধিকারবোধ অনুভব করলাম ওর কথা বলার ভঙ্গিতে।

কফি নিয়ে এল এয়ার হোসটেস। আমি ওর কাপ এগিয়ে দিলাম। সাথে আমার কাপেও কফি ঢেলে দিল। আমি ওর কফিতে চিনি আর কফিমেট মিশিয়ে দিলাম। কফিটার টেস্ট ভালো হোয়েছে বলল। “কফি নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে, শুনবে?” “নিশ্চয়ই শুনব। বলুন প্লিজ।” “আমি প্রথমবার যখন আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে যাই তখন আমি বেশ কতগুলো কফি নিয়ে যাই গিফটের জন্যে। আমার ছোট বোনের বিয়ে হোয়ে ছিল বেশি দিন হয় নি। আমার বোন-জামাইর ক’জন ফ্রেন্ড একবার আমার বোনের বাসায় এসেছিল। আমার বোন তাদের জিজ্ঞেস করছিল যে চা খাবেন না কফি খাবেন।

সবাই চা খেতেই চাইল কিন্তু এক ফ্রেন্ড বলল আমার বোনকে,”ভাবী, আমাকে কফি দেন। আমি কফি খুব লাইক করি।” যাই হোক, কফি নিয়ে প্রথমবার চুমুক দিয়েই বললেন,”ভাবী, কফির দুধটা মনে হয় পুড়ে গেছে। কেমন যেন পোড়া পোড়া গন্ধ আসছে।” উনার কথা শুনে সবাই হেসে দিয়েছিল। পরে আমার বোনের জামাইর কাছে সেই ফ্রেন্ড বলেছিল,”দোস্ত, কফিতো জীবনেও খাইনি তাই বুঝতে পারিনি যে কফির টেস্ট অমন পোড়া পোড়া হয়।”

আমি কথা শেষ করতে পারলাম না। কাঁচের চুড়ি ভাঙ্গার মত করে হেসে উঠল। আর আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম যে একজন মানুষের মন যখন ভাল থাকে আর সেসময়ে যদি সেই মানুষটা ওভাবে হেসে দেয় তবে কি ভীষণ সুন্দর লাগে। আমার মনে হোল যে হাসলেই ওর সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠে। ওর দিকে তাকিয়ে আমার মনটাও ওই সাত সকালে আরও ভালো হোয়ে গেল। খাবার শেষ হবার পর এয়ার হোসটেস আমাদের ট্রে দুটো নিয়ে গেল। আবার পা উঠিয়ে আরাম করে বসলাম। আমার দেখাদেখি ও ওর পা দুটো উঠিয়ে ব্ল্যাংকেট দিয়ে আটকিয়ে নিল।

হটাৎ খেয়াল করলাম যে ও একটু আনমনা হোয়ে পড়ল। আমি নিশ্চিত যে ওর দেশের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি সাথে সাথে সামনে থাকা ইন-ফ্লাইট ম্যাগাজিন নিয়ে ওকে দিয়ে বললাম,”দেখ এখানে কতো কিছু দেয়া আছে যদি তুমি কিনতে চাও। ও ম্যাগাজিনটা নিয়ে দেখতে লেগে গেল।

আমি ওকে সাইড থেকে দেখছিলাম ও যখন ম্যাগাজিনটা দেখছিল। প্লেনের জানালা দিয়ে সকালের সোনালি রোদ ঢুকছিল। অনেকটা বাংলাদেশের সোনালি বিকেল যাকে বলে কনে দেখার আলো । যখন আগে গ্রামে মেয়ে দেখতে এলে মেয়ের ফ্যামিলি ইচ্ছে করেই এমন সময় মেয়ে দেখাত যখন সূর্যের সোনালি আলো এসে মেয়েটার উপরে পড়তো আর মেয়েটাকে দেখতে বেশি সুন্দর লাগে।

ঠিক তেমনি করেই ওকে ওই সোনালি আলোতে মনে হচ্ছিলো যে ও সোনা দিয়ে বানানো একটা পুজোর প্রতিমা। হিন্দুদের দেবী। আমি বলতে পারবনা বাজি ধরে যে সে জানতো যে আমি ওকে দেখছি কিনা তবে এটা জানতাম যে বুঝতে পারছিল যে আমি ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স থাকে যা দিয়ে তারা বুঝতে পারে অনেক কিছুই। এটা অনেকটা ডিফেন্সিভ ম্যাকানিজমের মতো যা কিনা আপনা আপনিই কাজ করতে থাকে। মেয়েরা অনেক ছোট সময় থেকেই পুরুষের চোখের ভাষা পড়তে পারে।

হঠাৎ করে খেয়াল করলাম যে সে যেন কি খুঁজছে। জানতে চাইলে বলল যে চুলের রাবার ব্যান্ড। আমি আমার পায়ের দিকে তাকাতেই দেখি যে কি যেন একটা পড়ে আছে কার্পেটের উপর। আমি ওটাকে উঠিয়ে নিলাম কিন্তু ওকে দিলাম না। আমার হাত থেকে ও সেটা কেড়ে নিতে চাইল কিন্তু আমি দ্রুত ওর সামনে থেকে হাতে ধরা ওই ব্যান্ডটা পেছনে লুকিয়ে বললাম,”নোপ…নো ওয়ে আমি এটা তোমাকে দিচ্ছিনা। এটা আমি পেয়েছি সো এটা আমার। আর এটাকে আমি তোমার সুভেনিওর হিসাবে রেখে দিলাম।”

Hairband

ও ওর মিলিয়ন ওয়াটের হাসি দিয়ে বলল,”আপনি ওটা দিয়ে কি করবেন? আপনার স্ত্রী দেখলে আপনি একটা বিরাট সমস্যার মধ্যে পড়বেন।” আমি বললাম,”হ্যালো আপনি কি ভুলে গিয়েছেন যে আমার স্ত্রী আমার সাথে আসেনি আর সে বাংলাদেশেই আছে?” আমি ওর মুখের সামনে আবারো ব্যান্ডটাকে ঘুরিয়ে আমার শার্ট-এর ভেতরে চালান করে দিলাম। আর বললাম,”ওকে তুমি যদি খুঁজে নিতে পার তাহলে নাও।” ও মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে আবার ম্যাগাজিন দেখতে লাগলো।

আমি ভাবছিলাম যে কিছু একটা ব্যাপার আছে যার কারণে ওর বরের কথা তুলতেই ও করাচী আসার পথে কাল ওর চোখে কান্না এসে গিয়েছিল। আমি সাধারনত অতোটা কৌতূহলী না কিন্তু কেন যেন আমার ওর কথাগুল শুনতে ইচ্ছে করছিল। একবার ভাবছিলাম যে কি হবে জিজ্ঞেস করলেই হোয়ে যায়। আবার মনে হোচ্ছিল যে হয়ত না শোনাটাই ঠিক হবে।

এরকম দোটানায় কিছুটা সময় পাড়ি দিয়ে একসময় আমি ওর নাম ধরে ডেকে বললাম,”আচ্ছা তুমি কিভাবে একটা লোকের সাথে দেখা না করে, কথা না বলে জাস্ট তোমার বাবা-মার কথা শুনে বিয়ের মতো একটা মোস্ট ইম্পরট্যান্ট ডিসিশন নিয়ে নিলে? যদি তোমার মনের মতো সে না হয়, যদি তোমার বরকে তোমার ভালো না লাগে বা তার যদি আগে বিয়ে হোয়ে থাকে তাহলে কি হবে?”

ও আজ মন খারাপ না করে বলল,”না তা হবে কেন? আমার সাথে ফোনে কথা হোয়েছে বেশ ক’বার। ছবি দেখেছি। মনেতো হয় ভালোই হবে।“

আমি বললাম,”ভালো হোলেতো কথাই নেই কিন্তু ধরো যদি তোমার মন মতো না হয়। তখন?” আমি খেয়াল করলাম যে ও প্রাণপণে চেস্তা করছে যাতে ওর চোখ না ভিজে যায়। কিন্তু ওর সব প্রচেষ্টা নষ্ট করে দিয়ে ওর চোখ অশ্রুতে ভরে যাচ্ছে। আমি নিজেকে নিজেই বকা দিলাম মনে মনে যে কেন ওর চোখে জল নিয়ে এলাম। মিনিটখানেক চুপ করে রইল।

আমিও অনেকটাই অপ্রস্তুতঃ হোয়ে গেলাম। মানুষের কিছু কিছু উইক পয়েন্ট থাকে যেটা নিয়ে আর যাই হোক ফান করা যায়না।
আমি বললাম,”বলতে চাও কেন আমার কথা তোমার চোখে কান্না নিয়ে এল?” বলল,”পরে বলব।” কেমন যেন পরিবেশটা একটু অন্যরকম হোয়ে গেল। আমার বুকের ভেতরে কোথাও যেন একটু হাহাকার করে উঠল। আমার মন খারাপ হোয়ে গেলো আর ও সেটা বুঝতে পারছিল।

হটাৎ করে প্লেনের ক্যাপ্টেন একটা ম্যাসেজ দিল যে অনিবার্য কারণে আমাদের বাগদাদের বদলে মাস্কাট, ওমানে যেতে হচ্ছে । আমাকে ও জিজ্ঞেস করল যে কি বলল। আমি ওকে বুঝিয়ে বলাতে ও বলল,”কি হোল? তাহলে আমরা আমেরিকা যাব কিভাবে? আমাদের প্লেনতো বাগদাদ হোয়ে যাবে।”

আমি ওকে অভয় দিয়ে বললাম,”ডোন্ট ওয়রি, আমি নিশ্চিত যে নিশ্চয়ই কিছু গুরুতর প্রবলেম হোয়েছে যে আমাদের প্লেনের ডেসটিনেশন চেঞ্জ করতে বাধ্য হোয়েছে। আমাদের কোন প্রবলেম হবেনা কারণ এরকম সময়ে অনেক রকম রুল আছে যাতে আমরা আমাদের ফাইনাল ডেসটিনেশনে যেতে পারি। আসে পাশের যাত্রীরা অনেকেই বলা বলি করছিল যে কি কারণ হতে পারে এভাবে প্লেনের ডেসটিনেশন চেঞ্জ
করার।

নরমালি এরকম হয়না যেমন একবার নিউইয়র্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট হেভি বরফের কারণে আমাদের প্লেন নামতে না পারাতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় বোস্টন এয়ারপোর্টে। ওই রাত আমাদের হোটেলে রাখে এয়ারপ্লেন কর্তৃপক্ষ। খাবারের কোন প্রবলেম হয়নি আর পরদিন আর একটা প্লেনে করে আমাদের জে এফ কে এয়ারপোর্ট নামিয়ে দেয়। আর মজার ব্য্যাপার হোল যে কিছুদিন পর আমাকে ৪০০ ডলারের একটা ভাউচার পাঠিয়ে যাতে পরেরবার ওই ৪০০ ডলারের সাথে বাকি টাকা অ্যাড করে টিকিত কেনা যায়। এসব বলাতে দেখলাম যে ও একটু নিশ্চিন্ত হোল। ও বেশ চিন্তিত ছিল যে বিদেশে এসে বিপদেই পড়ল কিনা। আমি বুঝিয়ে বলাতে ও বলল,”আমাকে ফেলেতো পালিয়ে যাবেন না?”

আমি হাসবো না কাঁদবো নাকি ওর কথা শুনে রাগ করবো বুঝতে পারলাম না। শুধু বললাম,”তুমি কি মনে করো?” ও কিছু না বলে আমার দিকে কেমন যেন করুণ দৃষ্টিতে তাকালো আর সে দৃষ্টিতে কি যেন ছিল যা আমার মনটাকে একেবারে মোমের মতো গলিয়ে দিল। আমি হেসে বললাম,”আরে বাবা এটা কোন কথা হোল যে আমি তোমাকে রেখে পালিয়ে যাবো কিনা। দু’জনে একি সাথে প্রবলেম ফেস করবো তাছাড়া পালাতে চাইলেও কি আর পালানো যাবে? দরোজা বন্ধ আর আমারতো বড় পাখাও নেই যে উড়ে চলে যাবো।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *