লাভ ইন ওমান পর্ব – ৬

আমি বুঝতে পারছিলাম যে সে আমাকে ট্রাস্ট করেছে আর সেই ট্রাস্ট আমি কখনই ভাংবনা কিন্তু একই সাথে আমি একজন তরতাজা যুবক। আমি ওকে একটু ছুঁয়ে দিতে চাচ্ছিলাম। ওকে দেখতে এত নিস্পাপ আর নির্মল লাগছিলো যে শুধু একবার তাকে ছুঁয়ে দেখতে চাচ্ছিলাম যে সে কি বাস্তব নাকি কল্পনা? আহমদ সফা বলেছিল,”নারী, অর্ধেক বাস্তব তুমি অর্ধেক কল্পনা।” কিন্তু আমি নিজের কাছেই একটা প্রতিজ্ঞা করলাম ওর নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে যে কোনমতেই আমার সম্পর্কে ওকে এতোটুকু খারাপ ভাবতে দেবনা। একটা কোন সুযোগ ওকে দেবইনা যাতে ও আমাকে নিচু চোখে দেখতে পারে ।

রাত ১১ টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। আমি আমার ট্যাক্সি ড্রাইভারকে অনেক শুকরিয়া দিলাম আমাদের সেফলি হোটেলে ফিরিয়ে আনার জন্যে। আমি তাকে একটা মোটা রকমের টিপস দিলাম সাথে ভাড়ার টাকাতো রয়েছেই। ড্রাইভার খুব খুশি হোল আর আমার মাথার উপরে হাত রেখে আমাদের দু’জনকেই আশীর্বাদ করলো যাতে আমরা চিরজীবন একে অপরকে ভালোবেসে একসাথে কাটাটে পারি।
হোটেলের গেটের বাইরের হালকা আলোতে আমি দেখতে পেলাম যে ওর মুখ লজ্জায় লাল হোয়েগিয়েছে। ড্রাইভার ওকেও ওর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলো।

আমি আবার ওকে লজ্জা দেবার লোভ সামলাতে পারলাম না, বললাম,”কি ব্যাপার বলতো, সবাই আমার বউ হিসাবে তোমাকে দেখেছে কেন? এক কাজ করি। তোমাকে নিয়ে ভেগে যাই কি বল?” “এবার কেন জেন অতোটা লজ্জা পেলনা যতটুকু আমি আশা করেছিলাম। উলটো আমাকে বলে, “আমি বুঝে গেছি যে আপনি আমাকে লজ্জা দেবার জন্যে বলছেন আর সেজন্যেই আমি অতো লজ্জা পাচ্ছিনা।” আমি বললাম। “ধ্যাত্তেরি কি…। ধরা পড়ে গেলাম।”

আমরা লবির উপর দিয়ে ফ্রন্ট ডেস্কের সামনে দিয়ে চলে এলাম এলিভেটরের সামনে। আমি খেয়াল করলাম যে ফ্রন্ট ডেস্কে মাত্র একজন লোক কাজ করছিল আর সে তখনি আসা দু’জন গেস্ট এর সাথে খুব ব্যস্ত ছিল। আমাদের দিকে তাকালোনা পর্যন্ত। এলিভেটরের দরজা খুলে গেল আর আমরা দশ তলার বাটন পুশ করে চলে এলাম আমাদের রুমে।

রুমের দরজা বন্ধ করে আমি এসে বেড এর উপরে বসে পরলাম। রুমের ভেতরে বেশ ঠাণ্ডা। আমি এয়ার কন্ডিশনারটা অন কিনা দেখার জন্যে উঠে চেক করলাম কিন্তু সেটা অন ছিলনা। তখনি আমি খেয়াল করলাম যে বাইরের জানালাটা একটু খোলা ছিল আর রাতের ঠাণ্ডা বাতাস সেদিক দিয়ে ঢুকে রুমের ভেতরটা ঠাণ্ডা করে দিয়েছে।

আমি জানালা বন্ধ করে দিয়ে বললাম যে ওর কি ঠাণ্ডা লাগছে কিনা। ও মৃদু হেসে বলল যে ওর বরং বেশ আরাম লাগছে। আমি ওকে ওর শোবার ড্রেস পড়ে আসতে বললাম। ও বাথরুমে চলে গেল আর আমি এই সুযোগে তাড়াতাড়ি করে আমার স্লিপিং পাজামা আর গেঞ্জিটা পড়ে ফেললাম। ও ফিরে এলে আমি বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হোয়ে নিলাম।

আমি বললাম ওকে বেডের উপরে ঘুমাতে আর আমি সোফায় শোবো বলে জানালাম। মুস্কিল হোল যে সে আমাকে সোজা না করে দিল। যাকে বলে সোজাসুজি রিফুউজড করে দিল। ও একটা বালিশ আর ব্লাঙ্কেট নিয়ে সোজা এসে সোফার উপরে বসে পড়ল। আমি একটু হেসে বললাম,”বাচ্চাদের মতো জেদ করবেনা। একটা মারবো। যাও,যা বলি শোন।” ওর হাত ধরে টেনে বেডের উপরে বসিয়ে দিলাম।

বললাম,”শোনো আমার সোফার উপরে শুয়ে অভ্যাস আছে। সো ডোন্ট ওরি। কাল আমাদের অনেক লম্বা একটা জার্নি আছে। ঘুমানোর জন্যে সময় আছে মাত্র তিন ঘণ্টা। যতটুকু পারো ঘুমিয়ে নাও। ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে তিনটার সময় কল দেবে। জলদি করে গোসল করে বাই ৩.৩০ আমাদের নিচে যেতে হবে। আমাদের এয়ারপোর্টে ইরাকী এয়ারওয়েজের কাউনটারের সামনে থাকতে হবে বাই ৩.৪৫।

আমাদের ফ্লাইট উড়বে সকাল ৬.১০। প্রথমে সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নি টু বাগদাদ। সেখানে চার ঘণ্টার বিরতি। তারপর ৬ ঘন্টা লাগবে লন্ডন যেতে। লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে ১ ঘণ্টার আবার বিরতি। তারপর ফাইনালি আরো ৭ ঘণ্টার ফ্লাইট টু নিউ ইয়র্ক। তাহলে বুঝতেই পারছ যে কতো ধকল যাবে আমাদের উপর দিয়ে। সো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়।”

ও আমার সাথে আর জোরাজুরি করলনা। সোফার উপরে ব্লাঙ্কেটের অর্ধেক বিছিয়ে দিল যাতে বাকি অর্ধেক আমি আমার উপরে দিয়ে নিতে পারি। সাথে একটা বালিশও দিল। ও বেডের উপরে শুয়ে পড়ল কিন্তু তার আগে ডিম-লাইট জ্বালিয়ে রেগুলার লাইটটা নিভিয়ে দিল।

আমি বেশ ভালোই বুঝতে পারছিলাম যে ও ঘুমায়নি। সত্যি কথা বলতে ওর ঘুমানো উচিত না সম্পূর্ণ একজন অচেনা লোক একই সাথে একই রুমে ঘুমাচ্ছে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে একটা হোটেলের একটা রুমের ভেতরে থেকে ওর ঘুম আসা উচিত না। শুধু এই কারণটাই যে কোন মেয়েদের ঘুম হারাম করার জন্যে যথেষ্ট। আমি ওর নাম ধরে ডেকে বললাম,”শোন মেয়ে ভয়ের কোন কারণ নেই কারণ আমি একজন পারফেক্ট জেন্টেলম্যান। আমাদের অনেক দূরে যেতে হবে সেজন্যে ঘুমিয়ে পড়ো।”

আস্তে আস্তে আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর ৩ টার দিকে টেলিফোনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি ফোন উঠিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে বলল যে আমাদের ৩০ মিনিটের মধ্যেই রেডি হোয়ে নিচে যেতে হবে। আমাদের জন্যে গাড়ী ওয়েট করছে। ও ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে। আমি ওকে আগে ফ্রেশেন আপ হোয়ে যেতে বললাম। ও বাথরুম থেকে আসার পরেই আমি বাথরুমে গেলাম। মর্নিং রিচুয়াল এর পরই শাওয়ার নিলাম আমার জীবনের সবচেয়ে ফাস্ট শাওয়ার ওটা। আমি গোসল না করে চোখই খুলতেই পারিনা।

আমাদের ফ্লাইট যেহেতু ইরাকী এয়ারওয়েজের ছিল আমাদের বাগদাদ হোয়েই লন্ডন আর লন্ডন হোয়ে নিউইয়র্ক যেতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল এভিয়েশনের নিয়ম অনুসারে নিজের দেশ হোয়ে যেতে হয় প্রতিটা এয়ারলাইনের। বাগদাদ হোল ইরাকের রাজধানী।

Baghdad, Iraq

বাগদাদ পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো শহরের একটি। সেই পুরনো শহরের উপরে নতুন করে শহর বানানো হয় খলিফা আল মনসুরের সময়ে ইংরেজি ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে জুলাই। খলিফা আল মনসুরের এই শহর বানানোর উদ্দেশ্যই ছিল বাগদাদকে ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে ধনী আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। বাগদাদের জনসংখ্যা হোল ৭ লাখ। বাগদাদ আরব দেশগুলোর মাঝে কায়রোর পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর।.

বাগদাদ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে টাইগ্রিস নদী। আব্বাসিয়া বংশের সুলতান খলিফা আল মনসুরের সময় ইরাকের রাজধানী হিসাবে বানানো হয় আর শহর গোড়াপত্তনের খুব কম সময়ের মধ্যেই বাগদাদ পুরো ইসলামিক ওয়ার্ল্ডের মধ্যে অন্যতম সেরা শহর হিসাবে পরিচিতি পায় তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা এবং জ্ঞানী, গুণী লোকের সমাবেশের কারণে।

১২৫৮ সনে মঙ্গোল সাম্রাজ্য বাগদাদ আক্রমণ করে এবং বাগদাদ শহরকে ধ্বংস করে দেয়। এর পর থেকেই বাগদাদের গুরুত্ব কমতে থাকে। ফাইনালি ব্রিটিশদের কাছ থেকে ইরাক এক স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বাধীনতা লাভ করে আর আবারো ইরাকের রাজধানীরূপে নতুন জীবন লাভ
করে।

যা বলছিলাম… আমার সাধারনত প্লেন জার্নি ভালো লাগেনা। সেজন্যে সবসময় কম সময়ে ঢাকা থেকে আসা বা যাওয়ার সময় টিকেট কেনার চেষ্টা করতাম কিন্তু ওইবার তা আর হোয়ে ওঠেনি। যাই হোক, আমি ওকে বললাম যে ঢোলা আর আরামদায়ক ড্রেস পরার জন্যে যাতে লম্বা জার্নিটা কিছুটা হোলেও সহজ হোয়ে যায়। ও খুব ফাস্ট একটা শাওয়ার নিয়ে এলো। খেয়াল করলাম যে ও একটা লম্বা টি-শার্ট আর নিট প্যান্ট পড়ে এলো। আমার মনে হোল যে ও জানতো যে ওকে কি পড়লে ভালো দেখা যাবে। আমি ওকে একটা কমপ্লিমেন্ট দিলাম সুন্দর ম্যাচিং এর জন্যে।

আমরা রেডি হোয়ে ফ্রন্ট ডেস্ক এর সামনে চলে এলাম। আমাদের জন্যে ওয়েট করা বাসে উঠলাম। ও আমার পাশের সীটটাতে বসে পড়লো। হালকা কুয়াশার ভেতর দিয়ে বাসটা এয়ারপোর্টের দিকে ছুটে চলল। বাসের ভেতরের টেম্পারেচার একটু ঠাণ্ডাই মনে হোল। খেয়াল করলাম যে ও একটু কুঁকড়ে বসে আছে। আমার জ্যাকেটটা খুলে ওর উপরে দিয়ে দিলাম ওর আপত্তি না শুনে।

২০ মিনিটের মধ্যেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম। বাস থেকে নেমে ওর ব্যাগটা জোর করে ওর হাত থেকে নিয়ে নিলাম । ও বলল,”এত ঋণ শোধ করব কি করে? জানেন না যে দানে প্রতিদান বাড়ে।” আমি বললাম,”সে নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। সময় আসলে সুদে আসলে বুঝে নেব।” কথাগুলো মুখ থেকে বের হোয়ে এল কিন্তু আমি নিজেই বুঝতে পারলাম না যে আমি আসলে কি মিন করলাম।

আমরা ইরাকি এয়ার ওয়েজের জাম্বো জেটে বোর্ডিং করলাম সকাল ৫.৩০ মিনিটে। পাশাপাশি বসলাম। ওকে জানালার পাশের সীটে বসিয়ে আমি নিলাম আগের সীটটা। পাশের দু’টো সীট খালি রইল। এবার ওর আর সীটবেলট বাঁধতে প্রবলেম হোল না। পাশাপাশি বসা নিয়ে এবার আর কোন অকওয়ার্ড ফীল হোল না কারণ এরি মধ্যে আমরা ১৫ ঘণ্টা সময় পার করে এসেছি। যতক্ষণ না প্লেনের দরোজা বন্ধ হোল আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যাতে পাশের সীট এ কেউ না বসে। আমার প্রার্থনা মনে হোল কবুল হোল। খালিই রয়ে গেলো দু’টো সীট। যাক বাবা একটু আরাম করে বসা যাবে।

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ভোর ৬.৩০ টায় প্লেন আকাশে উড়ল বাগদাদের উদ্দেশে। সীট-বেলট খোলা যাবে সাইন আসার পর বেশ ইজি হোয়ে বসলাম মাঝের তিনটা হ্যান্ড-রেসট পেছন দিকে সরিয়ে দিয়ে। বললাম, “এবার একটু আরাম করে পা উঠিয়ে বস।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *