লাভ ইন ওমান পর্ব – ৫

আমি তাকে তাড়াতাড়ি কেউ দেখে ফেলার আগেই ট্যাক্সিতে বসতে বলার সময় আমার মনে হোল আমি বোধহয় ওর চোখে খানিকটা চিন্তার একটা ছায়া দেখতে পেলাম। আবারো তাড়া দেয়ায় সে ট্যাক্সিতে উঠে বসলো। আমিও পেছনের সিটে ওর সাথেই বসলাম। ট্যাক্সিটা ক্লিফটন বীচের দিকে ছুটে চলল। আমি এর আগে বেশ ক’বার বীচে ঘুরতে গিয়েছি আমার পাকিস্তানি বন্ধুদের সাথে বিশেষ করে যখনই আমি করাচীতে স্টপ ওভার করেছি।

করাচীতে আমার এক এক্স রুমমেট থাকে। সে পাকিস্তানি ছেলে। আমি যখন ফ্লোরিডা থাকতাম তখন আমার রুমমেট ছিল। সে ডাক্তারি পড়ার জন্যে পাকিস্তানে ফিরে যায়। আমি ক্লিফটন বীচ এরিয়াটা মোটামুটি চিনি কারণ আমি বেশ ক’বার ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। তাদের বাড়ি বীচের রাস্তার দিকেই কিন্তু আমি সেবার তাকে আমার আসার খবর জানালাম না। নইলে আমি এয়ারপোর্ট নেমেই প্রথমেই ওকে ফোন করে দিতাম আর সে আমাকে তার গাড়ী নিয়ে এসে নিয়ে যেত। আমি জানি আমার ফ্রেন্ড জানতে পারলে খুবই রাগ করতো। আমার সাথে থাকা এই মেয়েটি নিয়ে যাতে কোন প্রশ্নের সামনা সামনি না করতে হয় সেজন্যে আমি আর তার সাথে যোগাযোগই করলামনা ।

ট্যাক্সিটা ক্লিফটন বীচের দিকে ছুটে চলছিল। ট্যাক্সি ড্রাইভার খুব ভালো মানুষ বলে মনে হোল। সে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের আগে (১৯৭১) ঢাকাতেই ছিল। তার কথা শুনে মনে হোল যে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়াতে সে খুশি না। সে সব দোষ দিল ডারটি পলিটিশিয়ানদের যারা কিনা পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরা করেছে।

আমাদের ট্যাক্সি ফয়সল হাইওয়েতে ওঠা মাত্রই ড্রাইভার গাড়ীর স্পীড বাড়িয়ে দিল । ৬০ মাইল বেগে আমাদের গাড়ী ছুটে চলল । জানুয়ারির মাঝামাঝি সন্ধ্যেবেলার টেম্পারেচার বেশ আরামের।

গাড়ীর জানালা বন্ধ ছিল যাতে বাইরের ধুলা গাড়ীর ভেতরে না আসতে পারে। ও আমার কাছ থেকে একটু দূরে বসা আর আমিও চাচ্ছিলাম না যে কোনমতেই সে আমার সাথে আনকমফরটেবল ফীল না করে। ও একসময় ক’ মুহূর্তের জন্যে গাড়ীর জানালা খুলে দিল আর অমনই ওর কালো কন্ডিশন করা ঝরঝরে চুলগুলো উড়ে আমার মুখের উপরে এসে পড়লো। বেশ হালকা একটা সুন্দর একটা গন্ধ ভেসে আসছিল। আমার মুখের উপরে চুল এসে পড়াতে ও স্যরি বলে গাড়ীর জানালা উঠিয়ে দিল।

প্রায় ৪০ মিনিট পর আমাদের ট্যাক্সি যখন সী ভিউ রোডের কাছাকাছি এল তখন আমরা বীচের কাছে চলে এলাম। একটু পরেই আমরা বোর্ড ওয়াকে এসে নামলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে আমাদের জন্যে ওয়েট করতে বলে আমরা এগিয়ে গেলাম। আমাদের হাতে বেশি সময় ছিলনা আমি সেটা জানতাম। আমি এটাও ভাবছিলাম যে যদি ১১ তার মধ্যে আমরা হোটেলে না ফিরতে পারি তবে হয়তো আমাদের জন্যে খোঁজাখুঁজি শুরু হোয়ে যেতে পারে। তখন অলরেডি ৮ টা বেজে গেছে।

আমরা বোর্ড ওয়াকের উপর দিয়ে খানিকক্ষণ হাঁটলাম। পাশাপাশি। আমি খেয়াল করছিলাম যে অথবা এভাবে বলা যায় যে আমার মনে হচ্ছিলো যে ও হয়তো আমার হাত ধরতে চাচ্ছিল কিন্তু সাথে সাথে এটাও ভাবছিলাম যে হয়তো ও এতোটা ব্রেভ না যে আমার হাত ধরে ফেলবে। বেশ ক’বার দু’জনের হাতে দু’জনের টাচ্ লেগেছিল কিন্তু ওই পর্যন্তই। আর বেশিদূর যায়নি।

পশ্চিমের আকাশ এরি মধ্যে সূর্য লাল হোয়ে ডুবে গিয়েছিলো। ও আমাকে বলল যে ও কোনদিন ওভাবে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখেনি। আমি যে ওকে অমন সুন্দর একটা সন্ধ্যে উপহার দিয়েছিলাম সেজন্যে সে আমার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি মৃদু হেসে ওর দিকে তাকালাম । হাল্কা অন্ধকারে হয়তো সে আমার হাসি দেখতে পেল না। কিন্তু আমি ঠিকই দেখছিলাম যে ও খুব প্রানভরে সময়টা উপভোগ করছে।আমার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,”প্লিজ একটু বসুন না। এত সুন্দর রাত আমার জীবনে আর নাও আসতে পারে তাই একটু রয়ে সয়ে আস্তে আস্তে এই রাতটুকুর মজা নিতে চাইছি।”

আমরা বসে পড়লাম। সেও আমার পাশে বসে পড়লো কিন্তু আমি খেয়াল করলাম যে আমাদের মাঝে খানিকটা জায়গা রয়ে গেছে। ও হয়তো খেয়াল করছিলনা কিন্তু আমি শুধু ওর সাথেই ছিলাম না, আমি ওর প্রত্যেকটা জিনিস খেয়াল করছিলাম।

couple in sunset

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম যে আমার সাথে মনে হোচ্ছিল সে সেফ ফিল করছে আর আমি চাচ্ছিলাম যে ওর সেই ফিলিংটা যেন নষ্ট না হোয়ে যায়। বোর্ড ওয়াকের উপরে বসে দু’জনেই নিচে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। ও বেশ হ্যাপি মনে হোচ্ছিল। হালকা বাতাসে বেশ ভালো লাগছিল। করাচীতে সাধারনতঃ ঠাণ্ডা পড়ে না ঢাকার মতো। আমি ওকে বললাম যে আমার ক্ষিধে পেয়েছে আর আমি নিশ্চিত যে ওর ও ক্ষিধে পেয়েছিল।

আরব সাগরের তীরে হালকা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দু’জন সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ যারা কিনা ক’ঘণ্টা আগেও কেউ কাউকে চিনতো না অথচ দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ভাবতেই কেমন যেন একটা ঠাণ্ডা অনুভুতি গা বেয়ে নেমে যায়। এভাবেই বুঝি একজন অন্যজনের সাথে পরিচিত হয় আর এভাবেই বুঝি বন্ধুত্ব হোয়ে যায়। মানুষের প্রয়োজনে মানুষই এগিয়ে আসে আর সেই সময়ে যার উপরে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সঁপে দেয়া যায় তার সাথেই গড়ে ওঠে এক বিনি সুতোর মালার মতো একটা সম্পর্ক যাকে আমরা বলি বন্ধুত্ব। কেমন যেন একটা মুভির মতো আমার চোখের সামনে দিয়ে সব চলে যাচ্ছে।

আশে পাশে বেশ কতোগুলো ছোট খাটো সুভেনিয়রের দোকান ছিল। আমরা ওই দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম ফুডকোর্ট এর দিকে। কিছু কিনে দিতে চাইলাম কিন্তু সে সুন্দর করে আমাকে বুঝিয়ে বলল যে যদি ওর বর জিজ্ঞেস করে তখন সে মিথ্যে বলতে ভালো ফীল করবেনা । ফুডকোর্টে যেয়ে শিক কাবাব আর ম্যাংগো লাচ্ছির অর্ডার দিলাম আর বললাম যে তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, এক্ষুনি দৌড়ুতে হবে।

সে একটা শিক কাবাবের স্টিক নিল আর লাচ্ছিটা একটু একটু করে খাচ্ছিল। আমি রেস্টুরেন্টের ভেতরের হালকা আলোতে ওর সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেকটা হ্যাংলার মতো। জানিনা যে আমার ওইভাবে তাকিয়ে থাকাটাকে ও খেয়াল করেছিল কিনা। ওর নিশ্চিন্ত মুখটা দেখে মনে হচ্ছিলো যাকে ইংরেজিতে বলে,”এ ব্রেথ অফ ফ্রেশ এয়ার।” অমন সুন্দর একটা রোম্যান্টিক সন্ধ্যেয় আমিও কেমন যেন একটু রোম্যান্টিক হোয়ে যাচ্ছিলাম আর অমনি আমার ওয়াইফের মুখটা ভেসে ওঠে আর আমাকে নিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

ততক্ষনে ১০ টা ১০ বেযে গেছে। বীচে এসেছি ওরই মধ্যে দু’ঘণ্টা পার হোয়ে গেছে। আমাদের তক্ষুনি রওয়ানা না হলে দেরি হোয়ে যাবে। কখন যে সময় পার হোয়ে গিয়েছে বুঝতেই পারিনি। আমাদের ট্যাক্সি খুঁজে বের করে দু’জনে পেছনের সিটে বসে ড্রাইভারকে জলদি চালাতে বললাম। ড্রাইভার ‘জি আচ্ছা’ বলে ট্যাক্সি ছাড়ল।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম যে সে কি করে। ওর মুখ দেখে মনে হোচ্ছিল যে ওর বেশ ভালো লেগেছে সন্ধ্যেটা। আমি জানতে চাইলাম যে খাবার ভালো লেগেছিল কিনা। দারুণ একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আমাকে থ্যাংকস জানাল ওরকম দারুণ একটা রাত তাকে দেয়ার জন্যে। খুব সুন্দর একটা স্মৃতি দেয়ার জন্যে।

আমি বললাম,”স্মৃতি দেয়া মানে?” ও মিষ্টি করে উত্তর দিল,”আজকের ঘটনাতাো কালকেরই স্মৃতি তাইনা? আপনিই বলুন যে আমাদের দেশের ক’টা মেয়ের এমন ভাগ্য হয় যে দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে এসে সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটবে, কারো সাথে সুখ দুখের দু’টো কথা বলবে। এই যে আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এলেন যেটা ক’ঘণ্টা আগেও আমার চিন্তায় ছিলনা।”

“আমি কোনদিনই ভাবিনি বা বলা যায় ভাবার সাহস করিনি যে এভাবে একা একা বিদেশে যাব। আপনার সাথে পরিচিত হব।” আমি ওকে বললাম,”ওকে বুঝেছি যে তুমি হোলে স্মৃতি বানানোর মেশিন। আচ্ছা ধর, এত রাতে যাবার জন্যে হোটেলে আমাদের ঢুকতে দিলনা তখন কেমন হবে?” ও হাসতে হাসতে আমার হাত জোরে চেপে ধরল ।

ওর হাসি আমার কানে লক্ষ কোটি কোকিলের মধুর সুরের মতো মনে হোল। এবার সে আমার শরীরের সাথে টাচ করেই বসলো। যদিও রাস্তার পাশের লাইটগুলো থেকে আসা আলো আর ট্যাক্সির ড্যাশবোর্ড থেকে আসা মৃদু আলোতে দেখলাম যে ওর মুখটা যেন জ্বলছিল। কেমন যেন একটা আভা ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারপাশ ।

আমি প্রার্থনা করছিলাম,”হে খোদা আমাকে শক্তি দাও আমি যাতে নিজেকে সম্বরণ করতে পারি আর আমি যেন অমন একটা নির্মল মেয়ের কোন সুযোগ না নেই।” ওকে এত হ্যাপি লাগছিল দেখে আর আমি কোনমতেই যেন ওর সেই হাসিটা কেড়ে না নেই। আমি জানতাম যে আমাকে খুবই কেয়ারফুল থাকতে হবে কারণ আমার দিক থেকে একটা ভুল পুরো সিচুয়েশনটা চেঞ্জ করে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *