লাভ ইন ওমান পর্ব – ৩

Karachi international airport

Karachi Zinnah Int. Airport

এই প্রথমবারের মতো সে যাচ্ছে। সে তার বরের ছবি দেখাল। আমি ভালো মন্দ কোন কমেন্ট করলাম না ইচ্ছে করেই। তবে আমি জানতে চাইলাম যে ওর বর ওকে নিয়ে যেতে কেন আসেনি কিন্তু সে কোন উত্তর দিতে পারলনা যে কেন ওর বর ওকে নিতে আসতে পারেনি। তবে এটাও বললাম যে হাজারো কারণ থাকতে পারে তাছাড়া ওটা তার নিতান্তই ব্যক্তিগত বিষয় । কাজেই আমি আর ওই ব্যাপারে আগ্রহ দেখালাম না। শুধু একটা টিস্যু দিলাম চোখের জল মুছে ফেলার জন্যে ।

এভাবেই কথা বলতে বলতে কখন যে সময় পার হোয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। প্রথমবার প্লেন এ উঠেছে, প্রথমবার বিদেশে যাচ্ছে সেজন্যে আলাদা একটা এক্সাইমেনট ছিলই। শেষ পর্যন্ত তিন ঘণ্টা পর আমরা পাকিস্তানের করাচী এয়ারপোর্ট এ নামলাম। প্লেন থেকে নামার আগে এম্বারকেশন ফর্ম ফিল আপ করে দিলাম। আমি ওকে সাথে নিয়ে ইরাকি এয়ারওয়েজের কাস্টমার সার্ভিসে এলাম। আমাদের বাগদাদ হোয়ে ইরাকি এয়ারওয়েজ এর প্লেন নিয়ে লন্ডন হোয়ে নিউইয়র্ক যাবার কথা । ফ্লাইট ছাড়বে বারো ঘণ্টা পর।

কাস্টমার সার্ভিস থেকে আমাদের বাস দিয়ে নিয়ে আসা হোল একটা খুব সুন্দর হোটেলে। ওই হোটেলটা ছিল এয়ারপোর্ট হোটেল, করাচী । সাধারনত যেসব যাত্রীর ৮ ঘণ্টার চেয়ে বেশি যাত্রা বিরতী থাকে বা কোন কারণে ফ্লাইট মিস বা ডিলে হয় তাদের জন্য পি আই এ-র নিজস্ব হোটেল । এয়ারপোর্ট থেকে খুব কাছেই কিন্তু করাচী শহর থেকে বেশ দূরে। আমি বেশ ক’বার ওই হোটেলে থেকেছি সেজন্যে আমার মোটামুটি চেনা ছিল।

করাচী হোল পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর, প্রধান সমুদ্র বন্দর এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। একি সাথে সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী। বৃহত্তর করাচীর জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি আর করাচী শহরের জনসংখ্যা দেড় কোটি। করাচী হোল জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর প্রথম দশটা বড় শহরের অন্যতম। লোকে লোকারণ্য শহরটাতে রিকশা না থাকাতে ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি খালি খালি লাগে।

পাকিস্তানের ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি, আমদানি-রফতানি আর অর্থনৈতিক কার্যক্রমের প্রধান জায়গা। পাকিস্তানের সবগুলো বড় বড় কর্পোরেশন, যার মধ্যে টেক্সটাইল, শিপিং, ট্র্যান্সপোর্টেশন, সিমেন্ট এসবের হেড কোয়ার্টার করাচীতেই । আর্ট, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন, পাবলিশিং, মেডিকেল রিসার্চ এবং সফটওয়ার ডেভেলপমেনট। এছাড়া উচ্চ শিক্ষার জন্যে অনেক স্কুল, কলেজ এবং ইউনিভারসিটি আছে করাচীতে । মুসলিম দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক ছাত্র / ছাত্রী করাচী শহরে উচ্চ শিক্ষার জন্যে আসে।

হোটেলে আসার পর যখন আলাদা রুমের কথা আমি বললাম তখন সে আমার হাত পাশ থেকে শক্ত করে ধরে রইল আর দৃঢ় স্বরে আমাকে বলল যে সে ওই বিদেশের হোটেলের রুমে একা থাকতে পারবেনা। আমাকে আস্তে আস্তে বলতে লাগলো, “আপনি কথা দিয়েছেন যে আমাকে টেক কেয়ার করবেন। আমি একা রুমে মরে যাব।” আমি একটু হলেও অবাক হোলাম ওর কথা আর দৃঢ়তা দেখে। বুঝলাম যে সে বিদেশে এসে একা একটা রুমে থাকার চেয়ে একজন অপরিচিত স্বদেশী মানুষের সাথে একি রুমে থাকাটা বেশি সেফ মনে করছে।

কাউনটারের ওপাশে যেহেতু কেউ বাংলা জানেনা সেজন্যে আমি বেশ ক’বার জিজ্ঞেস করলাম যে একটু বেশি করে ভেবে দেখতে কিন্তু সে বলল যে গত তিন ঘণ্টা আমার সাথে কথা বলে এতটুকু মনে হোয়েছে যে সে ঠিক ডিসিশনই নিচ্ছে। সে বুঝতে পেরেছে যে আমি একজন ভালো মানুষ আর আমাকে দিয়ে ওর কোন ক্ষতি হবেনা। আমি মুচকি হেসে বললাম যে আমি লোকটা খারাপ নই।

হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের লোকেরা আমাদের একটাও কোন প্রশ্ন করলনা। আমি নিশ্চিত যে ওরা আমাদের সদ্য বিবাহিত কাপল্ ভেবেছে বিশেষ করে ও যেভাবে শক্ত করে আমার হাত ধরে থাকছিল সেটা দেখার পর যে কেউই ভাববে যে আমাদের রিসেন্টলি বিয়ে হোয়েছে । আমাদের রুমের চাবি দেয়ার সময় ফ্রন্ট ডেস্ক ক্লার্ক বলল যে আমাদের নেক্সট ফ্লাইট ভোর ৬.১০ আর সময়মত রুমে কল করে আমাদের জাগিয়ে দেবে যাতে আমরা গোসল করে, নাস্তা করে আর সময় মতো এয়ারপোর্টে যেতে পারি। আরও বলল যে ফ্রেশ হোয়ে ডিনার এর জন্যে রেস্টুরেন্ট-এ যেতে পারি। দু’জনের জন্যে ভাওচার দিল ।

বেল বয় আমাদের রুমে নিয়ে দরোজা খুলে দিয়ে চলে গেল। আমরা রুমে ঢুকলাম। আমি এক নজরে রুমটাকে ভালো করে দেখে নিলাম। একটা বড় বেড । পাশেই একটা সোফা । দুটো নাইট স্ট্যান্ডে দুটো নাইট লাম্প। বেশ ছিম ছাম কিন্তু বেশ কোযি। বিছানার ওপরে বেশ কতগুলো লাল গোলাপ ছড়ানো। আমি অনেকটা সারপ্রাইজড হোয়ে গেলাম। মনে হোল কোন এক রিসোর্টের হানিমুন সুইট এ চলে এসেছি।

ক’সেকেন্ডের জন্যে আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমি এর আগেও বেশ ক’বার এয়ারলাইন্সের হোটেলে থেকেছি কিন্তু এরকম কখনো দেখিনি। সেও বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। আমি কথা ঘুরানোর জন্যে ওকে ফ্রেশেন আপ হতে বললাম। ও বাথরুমে গেল হ্যান্ডব্যাগ থেকে দুই একটা কাপড় বের করে। আমি এই ফাঁকে বিছানার ওপর থেকে গোলাপগুলো সরিয়ে ফেললাম।

হোটেলের লবির আশে পাশে বেশ কতগুলো ডিজাইনার দোকান ছিল যেগুলো ছিল বিশেষ করে মেয়েদের জন্যেই। আমার মনে হোল যে আমরা যখন ডিনার এর জন্যে নিচে যাব তখন ওই ষ্টোরগুলোতে ওকে নিয়ে যাব আর আমি নিশ্চিত যে ওর ভালো লাগবে। এর আগে আমি যখনই এই দিক দিয়ে ফ্লাই করেছি তখনই আমি ১০ ডলার সিকিউরিটিকে ঘুষ দিয়ে হোটেল থেকে বের হোয়েছি। তারপর সোজা করাচী সিটিতে চলে গিয়ে স্ত্রী এর জন্যে এবং বোনদের জন্যে শপিং করেছি। কিন্তু তখনতো আর আমার সাথে আর কেউ ছিল না কিন্তু এখন আমার সাথে আরও একজন থাকাতে আমি সিটিতে যাবার চিন্তা বাদ দিলাম।

যখন ও বাথরুম থেকে ফিরে এল তখন আমি ওর দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তাকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছিল আর আমি তাকে কমপ্লিমেন্ট না দিয়ে পারলাম না। সে খুবই লজ্জা পেল মনে হোল। সলজ্জ দৃষ্টিতে আমার দিকে একটু তাকিয়েই আবার মাথা নীচু করে ফেলল। আমি বললাম,”শোন, কমপ্লিমেন্ট একসেপ্ট করতে হয়।” সে কোন উত্তর দিলনা শুধু মাথা নীচু করে একটু হাসল। আমি ওকে নিয়ে পেছন থেকে দরোজা টেনে বন্ধ করে বললাম,”চল, ডিনার করে আসি।” “চলুন” বলে সে আমার সাথে সাথে লিফট নিয়ে হোটেল লবিতে চলে এল। লবির সামনে ঝলমলে দোকানগুলো দেখে সে বলল,”চলুন না আগে ওই দোকানগুলোতে যাই। একটু পর না হয় খেয়ে নেয়া যাবে।”

আমি বললাম,”চল।“ ও আমাকে বলল যে এত সুন্দর সুন্দর ডিজাইনার কাপড়ের ছবি শুধু দেখেছে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে। সামনা সামনি দেখে সে খুব এক্সাইটেড। সে দেখছিল বিভিন্ন ডিজাইনের ড্রেস আর আমি দেখছিলাম ওকে। সে এত ব্যস্ত ছিল অতো সুন্দর ড্রেসগুলো নিয়ে যে কখন যে আমার হাত ধরে ফেলেছে সেটা ওর খেয়ালই ছিলনা। আমি দেখছিলাম বেশ শান্ত, সৌম্য আর মিষ্টি একটা মেয়েকে। ও এমনভাবে আমাকে ধরে রেখেছিল যে মনে হোচ্ছিলো যে আমি ওর হাজব্যান্ড। ওর চোখ দুটো ড্রেসগুলোর চকমকে পাথরগুলোর মতো করে জ্বলছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *