লাভ ইন ওমান পর্ব – ২

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আস্তে আস্তে এগুলাম কাস্টম আর ইমিগ্রেশনের দিকে আর তখনি দেখলাম যে ও আসছে পিছু পিছু। আমি একটু দাঁড়ালাম ওর জন্যে। আমাদের লাগেজ ততোক্ষণে চলে গিয়েছিল বলে শুধু একটা বড় ব্যাগ আর একটা ভানিটি ব্যাগ নিয়ে হাঁটছিল কিন্তু দুটো ব্যাগ একসাথে সামলাতে পারছিল না। আমি ও কিছু বোঝার আগেই ওর কাঁধ থেকে বড় ব্যাগটা নিয়ে নিলাম। আমাকে থ্যাংকস জানাল আর ওই প্রথম ওর আওয়াজ শুনলাম। ভারী মিষ্টি লাগলো ওর আওয়াজটা। আমি ওর কাছে ওর পাসপোর্ট চাইলাম আর সাথে আমার পাসপোর্টসহ ইমিগ্রেশন অফিসারকে দিলাম ডিপারচার সিল দেয়ার জন্যে । আমি আবারো ওর চাকা ছাড়া বড় ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ওর সাথে চলতে লাগলাম।

PIA Air Hostess

PIA Air Hostess

প্লেন ছাড়ার তখনো বেশ খানিকটা সময় বাকি ছিল। আমি বললাম,”চল, সামনের সোফাতে গিয়ে বসি।” সে বিনা বাক্য ব্যয়ে আমার কথা শুনল। আমি ওকে আগে বসার জন্যে হাত দিয়ে ইশারা করতেই ও পাশের চেয়ারে পায়ের উপরে পা রেখে বসে পড়লো। আর আমি একটা সোফাতে বসলাম । আমি আঁড়চোখে তাকে ভালো করে দেখে নিলাম। ভাবতে বাধ্য হলাম যে মেয়েটা বেশ আকর্ষণীয়াও বটে । একসময় লাউড স্পিকারে করাচীগামী ফ্লাইটের যাত্রীদের গেইটের দিকে যাবার জন্যে বলা হোলে আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “চল, ওই যে ডাকছে। প্লেন ছেড়ে দেবার সময় হোয়ে গেছে।”

প্লেনের ভেতরের সিটের কনফিগারেশন হোল ২-৪-২ আর সেভাবেই আমাদের সিট পড়লো পাশাপাশি। আমি ওকে জানালার পাশের সিটটাতে বসতে বললাম আর আমি নিলাম আইল সিট। সিটে বসে আমার বেশ টায়ার্ড লাগতে লাগলো কেন জানি। আবেশে আমার দু’চোখ বন্ধ হোয়ে এল। আমি চোখ বন্ধ করে মিনিট পাঁচেক সময় একেবারে চুপ করে বসে রইলাম। যখন চোখ খুললাম তখন দেখতে পেলাম যে ও সিটবেল্ট লাগানো নিয়ে রিতীমতো ফাইট করছে।

আমি ওকে সিটবেল্ট লাগাতে সাহায্য করলাম। এয়ারহোসটেস সবার সামনে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিল যে কিভাবে সিটবেল্ট লাগাতে হয় আর বাকি রেগুলার স্টেপগুলো বেশ নিপুনভাবে দেখিয়ে দিল যে ইমারজেন্সির সময়ে কিভাবে প্লেন থেকে বের হতে হবে, অক্সিজেন মাস্ক কিভাবে অপারেট করতে হবে ইত্যাদি । ও ওর মিষ্টি আওয়াজ দিয়ে আমাকে ডাকল আর বলল, “শুনুন, আমি মোটামুটি বুঝতে পারছি যে সে কি বলছে তবুও আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিন না প্লিজ।” আমি বুঝিয়ে বললে সে আমাকে থ্যাংকস জানায় আর আমি খেয়াল করলাম যে মেয়েটা বেশ ভদ্রতা জানে।

আনুসাঙ্গিক সবকিছু সেরে এক সময় প্লেন টেক অফ এর জন্যে রানওয়ে দিয়ে দৌড়ানো শুরু করল। যেহেতু সে এর আগে কখনো প্লেন জার্নি করেনি সে কারনে সে জানেনা যে কিভাবে প্লেন এতবড় শরীর নিয়ে শূন্য উড়বে। প্লেনটা আস্তে আস্তে দৌড়ানো শুরু করলো টেক অফ এর জন্যে নির্ধারিত গতি পাওয়ার আশায়। প্লেনের স্পীড বাড়তে বাড়তে হটাৎ করেই প্লেনটা উপরে উঠে গেল আর সে খুব জোরে আমার বাঁ হাতটা ধরে ফেলল। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম আর সে চোখে দেখতে পেলা কিছুটা ভয়। ওর আঙ্গুলের লম্বা নখগুলো আমার হাতের পাতলা চামড়া ভেদ করে ঢুকে গেল। বেশ ব্যথা পেলাম এবং মুখ বুঁজে সহ্য করে গেলাম।

যতক্ষণ প্লেন সোজা না হোল ততোক্ষন ও দুই চোখ বন্ধ করে আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখল। আমি মুচকি হেসে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে চোখ বন্ধ করে আছেত আছেই্‌। সে তার ঘুম ঘুম চোখ দুটো ওপেন করে ঠিকি কিন্তু তখনো আমার হাত ধরেই আছে। হঠাৎ করেই হয়তো ওর মনে হল যে সে আমার হাত ধরে আছে। ও তাড়াতাড়ি হাতটা ছেড়ে দিল ।

লজ্জা পেয়ে গেল আর বলল,”স্যরি, কখন যে আপনার হাত ধরে ফেলেছি বুঝতেই পারিনি।” আমি ওকে আর একটু লজ্জা দেবার সুযোগটা ছাড়তে চাইলাম না। আমি বললাম,”নো প্রবলেম।। করাচী নেমেই একটা অ্যামবুলেন্স কল করে সোজা হসপিটালে চলে গেলেই হবে।” এই দেখ বলে ওকে আমার হাতটা দেখালাম। এরি মধ্যে হাতের উপরে খামচির জায়গাতে নখের হাল্কা দাগ বসে গেছে।

সে লজ্জায় লাল হোয়ে গেল। আমি হাসতে হাসতে বললাম যে জাস্ট দুষ্টুমি করছি। আমি তাকে আরও লজ্জা দেবার জন্যে উহ আহ , ব্যথা করছে। এই পাইলট প্লেন থামাও। আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাও বলতে লাগলাম আর সে আরও বেশী করে লজ্জা পেতে লাগল আর ওর লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখে খুবই মজা পেলাম। মাথা নীচু করে বলল, “আপনি তো ভারি পাজি। আমাকে এইভাবে লজ্জা দিলেন।” আমি বললাম,”শোন মেয়ে, যেভাবেই বলনা কেন, সত্যি কথা হোল যে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা আমার সাথেই কাটাতে হবে সেজন্যে শুধু তোমাকে আমার সাথে ইজি করে নিতে চাচ্ছি যাতে আমাদের পাশাপাশি জার্নিটা খুব মজার হয়। তাতে সময় ভালো কাটবে।” সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,”কথাটা কিন্তু ঠিকি বলেছেন।”

আধা ঘণ্টা পর খাবার সারভ করল। বাশমতি চালের পোলাও, বীফ, তিন/ চারটে ভেজিটেবলের টুকরা, লেটুস, টমেটো, উপরে একটা অলিভ, টক দই, পুঁদিনা পাতা আর শসার চিকন পিস দিয়ে বানানো রায়তা, ডিনার রোল, বাটার, পেস্ত্রি, গরম চা ছিল। দেখলাম যে সে খুব পিকি ইটার। ওর খাবারের বেশির ভাগই সে আমাকে দিয়ে দিল। আমার হাজার মানাও সে শুনলনা। আমি ইচ্ছে করেই কাঁটাচামচ দিয়ে কৃত্তিম বাধা দেবার চেষ্টা করলাম। বললাম,” আর কিছু দিলে কিন্তু কাঁটা চামচ ফাইট হোয়ে যাবে।”

সে আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার হাত ধরে আটকে রেখে তারপর আমার প্লেটে খাবারগুলো ঢেলে দিল। আমার ভালো লাগলো এই ভেবে যে আস্তে আস্তে বেশ ফ্রেন্ডলি হোয়ে যাচ্ছিল। খাবার শেষ হবার পর আমি ওকে বল্লাম,” শোন, একটা কথা বলি । চল আমরা দু’জন বন্ধু হোয়ে যাই। এত লম্বা জার্নি মানে প্রায় দশ হাজার মাইল রাস্তা সহজে ফুরিয়ে যাবে যদি আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়,” সে আমার কথায় সায় দিল আর বলল যে বন্ধু হোতে আপত্তি নেই।

সে আমাকে আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে জানতে চাইল, আমার আমেরিকান জীবন সম্পর্কে আগ্রহ দেখাল, কবে বিয়ে করেছি আর কোন ছেলে মেয়ে আছে কিনা সেটাও জানতে চাইল। আমি ওকে আমার সম্পর্কে বললাম। আমার স্ত্রী আর আমার ৪ মাসের মেয়েকে তো ও দেখেছিল তাদের ছবি আছে কিনা আর থাকলে আবার দেখতে চাইল।

ওর সম্পর্কে জানতে চাইলাম। বাবা-মার একমাত্র মেয়ে। বাবা ব্যাবসা করে। দুই ভাই আছে ওর বড়। ওর বর আর বিয়ের কথা জানতে চাইলে ওর মুখটা কেমন যেন মলিন হোয়ে গেল। খানিক্ষণ চুপ করে রইল কিন্তু পরক্ষনেই সামলে নিল কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম যে ও বলতে চাচ্ছিলনা । আমি বললাম,”বলতে না চাইলে বলার দরকার নেই।”

ও মলিন হেসে বলল,”মনে আছে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে…? আর অনেকটা সময় একি সাথে থাকব সেজন্যে লুকোতে চাইলেও আর কতটুকুই বা লুকোতে পারব বলুন ? তার চেয়ে বলে ফেলাই ভাল।। আমার সাথে টেলিফোনের মাধ্যমে বিয়ে হয় । কোনদিন তাকে দেখিনি। জানিনা তার চারটে হাত আর ছয়টা পা আছে কিনা । আমার অসম্ভব রাগী বাবার কথা বিয়ে কর আর ভয়ে আমিও না করতে পারিনি।” ওর চোখে জল । শুনে আমি খুব অবাক হোয়ে গেলাম যে কিভাবে সম্ভব একজন বাবার পক্ষে মেয়েটাকে একজন অপরিচিত কার কাছে তুলে দেয়া ?

“তোমার বরের সাথে কি নিয়মিত কথা হয়না ?” আমি জানতে চাইলাম। ও বলল যে ওর বর ওর ছেয়ে ১০ বছরের বড় তাই এত দিনে ওই বয়সের দূরত্ব কমেনি বরং বেড়েছে। মাঝে মাঝে দশ পনেরো মিনিটের জন্যে কথা হয় তাও মনে হয় শুধু কথা বলার জন্যেই কথা বলা। সেখানে না আছে কোন প্রেম আর না আছে কোন ভালোবাসা । ওর বর যে সে খুব কম কথা বলে সেজন্যে অর সাথে কোন বন্ধুত্ত গড়ে উঠেনি। ছ’ মাসের মতো বিয়ে হোয়েছে আর ওর বর ওর জন্যে ইমিগ্রেশনে অ্যাপ্লাই করেছিল আর সেই হিসাবে ভিসা হোয় যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *