লাভ ইন ওমান পর্ব – ১

Zia International Airport-At Night-Dhaka

মানুষের জীবনটা সত্যি বিচিত্র। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক মার্ক টোআইন বলেছিলেন,” Truth is stranger than fiction” যেমন করে বাস্তব কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায় তেমনি করে মানুষের জীবনে ঘটে যায় কিছু কিছু ঘটনা যা মাঝে মাঝে কল্পনাকেও হার মানায়। এক জীবনে কখন যে কে কোন দিক দিয়ে এসে কিভাবে নিজের জীবনের সাথে মিশে যায় সেটা কেউ বলতে পারে না। কোন রাস্তার মোড়ে কে যে কার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে যেমন কেউ বলতে পারেনা তেমনি জীবনের চলার পথের কোন বাঁকে কার হাত যে ছুটে যায় আর কে যে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায় সেটাও কারো পক্ষে আগে থেকে আঁচ করা সম্ভব না।

১৯৯১ সনের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ বাংলাদেশ সময় দুপুর ২ টা । সেদিন ছিল বুধবার। আমি সেদিন পি আই এর বিকেল সাড়ে তিনটার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে করাচী হোয়ে নিউইয়র্ক আসছিলাম। আমার ফ্লাইটের রুট ছিল ঢাকা-করাচী পাকিস্তান ইনটার ন্যাশনাল এয়ারলাইনস্, করাচী থেকে ইরাকি এয়ারওয়েজ নিয়ে বাগদাদ, লন্ডন হোয়ে নিউইয়র্ক (আজ থেকে প্রায় ২৪ বছর আগে যোগাযোগ ব্যাবস্থা এখনকার মতো সোজা ছিলনা। তখন আমাদের অনেক ঘুরে আমেরিকা আসতে হতো)।

আমি যখন বোর্ডিং পাস নেয়ার জন্যে টিকেট কাউনটারের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি তখন আমার মনে হলো যে কে যেন আমার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে আমার পিঠের উপরে আলতো করে স্পর্শ করছে । আমি ঘুরে তাকাতেই দেখলাম যে একজন আমারি সমবয়সী একজন আমাকে ডিস্টার্ব করার জন্যে ক্ষমা চেয়ে আমার কাছে জানতে চাইলো যে আমি কি আমেরিকা যাচ্ছি কিনা। আমি হ্যাঁ বলতেই সে বলল যে টিকেট কাউনটার থেকে সে জেনেছে যে এই ফ্লাইটে একমাত্র আমিই আমেরিকা যাচ্ছি। দেখে মনে হল যে সে অনেকটা নিশ্চিন্ত হোল আমার কথা শুনে ।

pia

আমি তার জন্যে কি করতে পারি জানতে চাওয়াতে সে বলল যে ওর ছোট বোন প্রথমবারের মতো আমেরিকা যাচ্ছে হাজব্যান্ড এর কাছে। জীবনে মেয়েটি কখনো একা নিউ মার্কেট বা গাওসিয়া মার্কেটে যায়নি কিন্তু তাকে এত দুরে একা যেতে হোচ্ছে। জীবনে ও প্লেনে উঠে কোথাও যায়নি আর এখন তাকে যেতে হচ্ছে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে । তাছাড়া মেয়েটি দূরের জার্নিতে একটু সাহায্য ও সহযোগিতা করি তাহলে পুরো ফ্যামিলি নিশ্চিন্ত হতে পারে। আমি অভয় দিয়ে বললাম যে কোন অসুবিধা নেই। আর আমি রাস্তায় নিশ্চয় সাহায্য করব।

আমি ওর পাসপোর্টটা চেয়ে নিলাম যাতে একি সাথে দু’জনের সিট নেয়া যায় যাতে রাস্তায় কথা বলে সময় কাটানো যায়। ছেলেটা খুশি হোয়ে আমাকে পাসপোর্টটা দিয়ে ওর বোনকে ডাকতে গেল। আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আমার স্ত্রী। আমি চলে যাচ্ছি বলে খুব মন খারাপ। আমার একটা হাত ধরেছিল সে। আমার চার মাসের ছোট্ট মেয়েটা বার বার আমার কাছে আসার জন্যে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি একটু কোলে নিয়ে আবার আমার স্ত্রী-এর কাছে ওকে দিয়ে দেই। কিন্তু কিছুই করার নেই কারণ আমার স্ত্রী এর আমেরিকা আসতে আর বছর খানেক সময় বাকি ছিল। আমার খুব কষ্ট হোচ্ছিল ওদের জন্যে ।

পরিবারের বাকি সবার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মেয়েটিকে ওর ভাই ডাক দিল আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে। ও লজ্জায় জড়িয়ে আমার দিকে তাকাল ঘুম ঘুম চোখে। আমি দেখলাম অসম্ভব মায়া ধরানো একজন যাকে দেখা মাত্রই যে কোন মানুষের মন ভালো হোয়ে যাবে । ওর নাকের উপরে বাংলাদেশের জানুয়ারির হাল্কা শীতের মাঝেও চিক্ চিক্ করছিলো একটা ঘাম বিন্দু। ওর ঘুম ঘুম সুন্দর দুটো চোখ সাথে একদম নিখুঁতভাবে ভ্রূ বানানো। ওর শরীর থেকে মিষ্টি একটা সেন্ট-এর গন্ধ ভেসে আসছিল। আমি অনেকটা সম্মোহিতর মতো তাকিয়ে রইলাম ক’সেকেন্ডর জন্যে।

ওর ভাই ওকে বলল যে আমিই একমাত্র যাত্রী যে কিনা নিউইয়র্ক যাচ্ছি। সে আমার দিকে ওর সেই মায়াবী চোখ দুটো উঠিয়ে সাইলেন্টলি আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা নাড়াল। আমিও মাথা ঝেঁকে জানিয়ে দিলাম যে শি ওয়াজ ওয়েলকাম। নিজের পরিচয় দিলাম আর বললাম যে নার্ভাস হবার কোন কারণ নেই। আমিতো একেবারে শেষ পর্যন্ত ওর সাথে যাচ্ছি সেজন্যে নার্ভাস বা ভয়ের কোন প্রশ্নই আসেনা। আমার কথা শুনে একটু মিষ্টি করে শুকনো হাসি দিয়ে মেয়েটা চলে গেল ওর পরিবারের দিকে আর আমি আমার স্ত্রী আর মা, বাবাসহ সবার দিকে এগিয়ে গেলাম বিদায় নেবার জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *